পোস্টগুলি

জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে

কেরোসিন | ভোটের রাজনীতির তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ কবিতা — এস এফ সেলিম আহম্মেদ

  কেরোসিন — এস এফ সেলিম আহম্মেদ ভোট এলেই দেশে নামে হিম, নেতার গলায় কাঁপে সুর-ছিম। পকেট ফাঁকে লুকানো থাকে, কেরোসিন— কথা-চুলায় ঝাকে। আগুন নেই, তবু ঢালা হয়, ভাষণ জ্বলে, বিবেক ক্ষয়। ক্ষুধার চুলায় স্বপ্ন সেঁকে, ভবিষ্যৎ পোড়ে প্রতিশ্রুতির ফাঁকে। যেখানে প্রশ্ন, সেখানেই হাঁক, যেখানে যুক্তি— স্লোগান পাক। দাম বাড়লে বিশ্ববাজার দোষী, ভোট চাইলে নেতা হন অতি ঘোষী। জনতা জ্বালে আগুন জোরে, নেতা দাঁড়ান ছবি তোলার ঘোরে। ঘর পুড়লে জনতার দায়, নিভলে আগুন— নেতা গায়। ভোট শেষে মাঠ হয় ফাঁকা, শিশি খালি, প্রতিশ্রুতি ঠাঁকা। ধোঁয়া জমে গণতন্ত্রের বুকে, স্বপ্ন খোঁজে পোড়া সুখে। কেরোসিন তেল নয়— অস্ত্র, সময় বুঝে ঢালা মন্ত্র। ছন্দে ছন্দে সত্য লিখি, আলো কম— ধোঁয়াই বেশি রাজনীতি।

কে তুমি? | আধুনিক ছন্দময় কবিতা — এস এফ সেলিম আহম্মেদ

  কে তুমি? — এস এফ সেলিম আহম্মেদ কে তুমি— ভোরের প্রথম নোটিফিকেশন, ঘুম ভাঙার আগেই মনের স্ক্রিনে জ্বলে ওঠা এক নীল আলো? কে তুমি— শহরের ক্লান্ত ট্রাফিকের ভেতর হঠাৎ পাওয়া ফাঁকা লেন, যেখানে নিঃশ্বাস একটু ধীরে চলে? তুমি কি অসমাপ্ত বার্তার তিনটি ডট, যা বলেও বলে না— তবু সারারাত জাগিয়ে রাখে? তুমি কি ডিজিটাল কোলাহলের মাঝে এক টুকরো নীরবতা, যার শব্দে হৃদয় শুনতে পায় নিজেকে? আমি যখন প্রশ্ন করি— কে তুমি? তুমি তখন উত্তর হও না, তুমি হয়ে যাও প্রশ্নের গভীরতা। তুমি নাম নও, তুমি অনুভব— ছোঁয়া ছাড়াই ছুঁয়ে যাওয়া এক আধুনিক বিস্ময়। কে তুমি? হয়তো তুমি আমি, হয়তো আমি নই— এই দ্বিধার মধ্যেই তুমি সবচেয়ে স্পষ্ট।

পিনিক : নির্বাচন, সংসদ ও উন্নয়নের রাজনীতি

পিনিক (ছন্দের রাজনীতি) এস এফ সেলিম আহম্মেদ ভোট এলেই দেশ জাগে, পিনিক বাজে টনটন, নেতা বলে—জনগণই, বাকিটা সব কল্পন। হাত মেলাও, হাসি ঢালো, প্রতিশ্রুতির ঢেউ, ভোট পড়লেই মনে পড়ে—জনগণ মানে কেউ? ব্যালট বাক্সে ঢুকল আশা, বেরোল খালি হিসাব, পাঁচ বছর দেশ চলবে এখন বক্তৃতার জবাব। সংসদ বসে, চোখ বুজে, আইন পাশের গান, হাত তোলে যন্ত্রমানব—বিবেক গেল বনবাস। উন্নয়ন আসে মিছিলে, পোস্টারে আর স্লোগানে, গর্ত ভরে রাস্তায় রাস্তায়, শব্দ ভরে বাণীতে। সেতু দাঁড়ায় টিভির ভেতর, নদী ভাঙে ঘর, ফিতা কাটে মন্ত্রীজী—হাসে ক্যামেরার দল। বিরোধী মানেই শত্রু আজ, প্রশ্ন মানেই দোষ, যুক্তি দিলে মামলা খাও—এই নিয়মটাই ঘোষ। সংবিধান থাকে শোকেসে, ক্ষমতা থাকে হাতে, দেশ চলে পিনিক তালে, সত্য থাকে ঘাটে। কৃষক কাঁদে ধান বেচে, শ্রমিক কাঁদে ঘামে, নেতা বলে—সব ঠিক আছে, উন্নয়ন চলছে নামে। টিভির দেশে স্বর্গরাজ্য, বাস্তবে শুধু দেনা, পেটের ভেতর হাহাকার, মাইকে বাজে জয়ধ্বনি শেনা। পিনিক বাজে দিনরাত, তাল হারায় মানুষ, ভোটার থেকে দর্শক হল—এই-ই সবচেয়ে দুঃসাহস। তবু ছন্দই শেষ প্রতিবাদ, কলম থ...

কুকুর ছানা : একটি বিস্ফোরক রাজনৈতিক ব্যঙ্গ কবিতা

 কুকুর ছানা   — এস এফ সেলিম আহম্মেদ ওরা বলে—   শিশু, নিষ্পাপ, কুকুর ছানা!   আমি বলি—   এরা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় কামড়বাজ। জন্মের পরই শেখে   কীভাবে লেজ নাড়াতে হয় ক্ষমতার সামনে,   আর দাঁত বসাতে হয়   জনতার পায়ের রগে। ভোট এলে ওরা গণতন্ত্র চাটে,   ভাত পেলে আদর্শ চিবোয়,   হাড় পেলে দেশ গিলে ফেলে—   এটাই ওদের জাতীয় পাঠ্যক্রম। একটা শিস,   একটা ফোন কল,   একটা ফেসবুক পোস্ট—   আর ছানারা রাস্তায় নেমে   দেশপ্রেমের নামে   মানুষ কামড়ায়। মা কুকুর জানে,   এই ছানারা বড় হলে   মন্ত্রী হবে, নেতা হবে,   অথবা উন্নয়নের পাহারাদার—   ঘেউ ঘেউ করে পাহারা দেবে   চুরি করা স্বপ্নের গোডাউন। ওরা ইতিহাস লেখে না,   ইতিহাসে থুথু ছেটায়।   ওরা যুক্তি দেয় না,   গণতন্ত্রকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত করে। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার?   এই কুকুর ছানারাই   নিজেদের বলে—   "দেশের ভবিষ্যৎ...

সত্যের আলো : বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিড়ে সত্যের নীরব উচ্চারণ

  সত্যের আলো শব্দের ভিড়ে শব্দ ছুড়ে, ছায়া ঢাকে চোখ, বিভ্রান্তিকর তথ্য বুনে, নীরব হয় সত্যলোক। রঙিন বাক্যে মোড়া মিথ্যা, ঝলমলে আর জোর, সত্য দাঁড়ায় নীরব হয়ে—অল্প আলো, গভীর ভোর। হেডলাইনে চিৎকার বেশি, প্রমাণ থাকে ফাঁক, কানে ঢুকে মনে বসে—ভাবনার ওপর ডাক। একটু থামো, প্রশ্ন করো, যাচাই করো বার, সত্য কখনো ভয় পায় না—সময়ই তার ভার। মিথ্যা দৌড়ায় দ্রুত পথে, ক্লিকের পিছে ছুটে, সত্য হাঁটে ধীরে ধীরে, শেকড় গাঁথে মাটিতে। আজ যদি আলো জ্বালাও, যুক্তির প্রদীপ হাতে, কাল বিভ্রান্তির কুয়াশা মিলবে সত্যর পথে। কবি: এস এফ সেলিম আহম্মেদ সূত্র: sfselimahmmed.blogspot.com

১৮ টি বুলেটের পরে | অধ্যায় ৭ : যারা বেঁচে থাকে

 ১৮ টি বুলেটের পরে   (অধ্যায় ৭ : যারা বেঁচে থাকে) - এস এফ সেলিম আহম্মেদ  মূল অংশ: সবাই মারা যায় না। কিছু মানুষ বেঁচে থাকে— সাক্ষ্য হয়ে। রাশেদের কোনো কবর নেই। কিন্তু তার লেখা আছে। আর লেখা কখনো কবর মানে না। শহীদ শেষ পর্যন্ত কথা বলেছিল। নামে নয়। মুখে নয়। কণ্ঠে নয়। সে কথা বলেছিল কাগজে। সাক্ষ্যে। নথিতে। কেউ শাস্তি পায়নি। এটাই রাষ্ট্রের বিজয়। কিন্তু এটাও বিজয়— সবাই ভুলে যায়নি। নুরুর মা এখনো জানালার পাশে বসেন। তিনি অপেক্ষা করেন না। তিনি শুধু মনে রাখেন। এই উপন্যাস কোনো আদালতের রায় নয়। এটা কোনো রাজনৈতিক ঘোষণাও নয়। এটা শুধু মনে রাখার চেষ্টা। কারণ ইতিহাস বলে— যে সমাজ ভুলে যায়, সে সমাজ আবারও ১৮টি বুলেট তৈরি করে। আর যারা এই গল্প পড়ে এক মুহূর্ত থামে, একবার প্রশ্ন করে, একবার ভয় পায়— তারা হয়তো নতুন কোনো অধ্যায়ের শুরু। ১৮ টি বুলেটের পরে সবকিছু শেষ হয় না। কিছু মানুষ বেঁচে থাকে। আর তারাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

১৮ টি বুলেটের পরে | অধ্যায় ৬ : সত্যের শত্রুরা

 ১৮ টি বুলেটের পরে   (অধ্যায় ৬ : সত্যের শত্রুরা) - এস এফ সেলিম আহম্মেদ  মূল অংশ: সত্য কখনো একা আসে না। সত্যের সাথে আসে ভয়, আর ভয়ের সাথে আসে শত্রু। রাশেদ যখন প্রথম লেখাটা শেষ করল, সে বুঝতে পারেনি— এই লেখাটা আসলে তার নিজের মৃত্যুর খসড়া কিনা। সে কোনো নাম লেখেনি। কোনো তারিখ লেখেনি। কোনো দলের নামও না। সে শুধু ঘটনাগুলো লিখেছিল। যেমন ঘটে। যেমন কেউ কখনো লিখতে সাহস করে না। রাষ্ট্রের সমস্যা এখানেই। রাষ্ট্র মিথ্যা সামলাতে জানে, কিন্তু সত্য সামলাতে জানে না। কারণ সত্যে ব্যাখ্যা লাগে, আর ব্যাখ্যা মানেই প্রশ্ন। রাশেদের লেখাটা হাতে হাতে ঘুরতে শুরু করল। বন্ধুর ফোনে। একজন সাংবাদিকের কাছে। একজন আইনজীবীর ড্রয়ারে। লেখাটা ছড়ানোর সাথে সাথে ভয়ও ছড়াতে শুরু করল। এক রাতে শহীদের বাসার সামনে অপরিচিত দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল— “ভাই, বেশি জানলে ঘুম কমে।” এই বাক্যটাই ছিল হুমকি। রাষ্ট্র খুব ভদ্রভাবে হুমকি দিতে জানে। শহীদ সেই রাতেই বুঝেছিল— এখন আর পেছন ফেরার জায়গা নেই। নুরুর মায়ের কাছে একদিন একজন এসেছিল। ভদ্র মানুষ। ভালো কথা। শেষে বলেছিল— “মা, পুরোনো কথা মনে রাখলে বুক ভারী ...

১৮ টি বুলেটের পরে | অধ্যায় ৫ : সাক্ষ্যের দাম

 ১৮ টি বুলেটের পরে   (অধ্যায় ৫ : সাক্ষ্যের দাম) - এস এফ সেলিম আহম্মেদ  মূল অংশ: সাক্ষ্য কখনো চিৎকার করে না। সাক্ষ্য দাঁড়িয়ে থাকে। চুপচাপ। ঠিক মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে। নুরুর মৃত্যুর পর যে পাঁচজন মানুষ সেই পরিত্যক্ত ঘরে বসেছিল, তারা তখনো নিজেদের “সাক্ষী” ভাবেনি। তারা শুধু ভেবেছিল—ভুলে না যাওয়ার দায়টা নিতে হবে। এই দায়টাই ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। রাষ্ট্র জানে, প্রতিবাদকারীকে দমন করা যায়, কিন্তু সাক্ষীকে নিশ্চুপ করা কঠিন। কারণ সাক্ষী মিথ্যা বলে না, সে শুধু যা দেখেছে, সেটাই বহন করে। নুরুর এক বন্ধু—রাশেদ— প্রথম বুঝতে পারে, কিছু একটা বদলাচ্ছে। তার ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কল আসতে শুরু করে। কেউ কথা বলে না। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। কখনো হালকা হাসি। ভয়কে এভাবে পাঠানো হয়। শব্দ ছাড়াই। রাশেদ জানত, এগুলো কাকতাল নয়। সে নুরুকে তুলে নেওয়ার রাতের দৃশ্য দেখেছিল। সাদা মাইক্রোবাস। দরজার শব্দ। চুপ করে থাকা প্রতিবেশীরা। রাষ্ট্র সব সময় প্রথমে সাক্ষীকেই খোঁজে। নুরুর মা একদিন রাশেদকে ডেকে বলেছিলেন— “বাবা, তুমি যা জানো, মনে রেখো। বলতে না পারলেও মনে রেখো। মরে গেলেও মনে রেখো।” এই কথার ভেতর ছিল এক ধ...

১৮ টি বুলেটের পরে | অধ্যায় ৪ : নীরবতার সহযোদ্ধারা

 ১৮ টি বুলেটের পরে   (অধ্যায় ৪ : নীরবতার সহযোদ্ধারা) -এস এফ সেলিম আহম্মেদ  মূল অংশ: নুরুর মৃত্যুর পর শহরে দুই ধরনের মানুষ দেখা গেল। একদল যারা কিছুই দেখেনি, আরেকদল যারা সব দেখেও কিছু বলেনি। দ্বিতীয় দলটাই ছিল বেশি বিপজ্জনক। কারণ তারা জানত। জানার পরও তারা চুপ ছিল। এই চুপ থাকা কোনো নিরীহ নীরবতা নয়, এটা ছিল হিসাবি। পরিমিত। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য গড়ে তোলা এক ধরনের নৈতিক আত্মসমর্পণ। নুরুর জানাজার দিন একজন প্রবীণ মানুষ ফিসফিস করে বলেছিলেন— “ছেলেটা ভালো ছিল, কিন্তু সময়টা খারাপ।” এই একটি বাক্যেই যেন সব দায় ঝেড়ে ফেলা হলো। সময় খারাপ— এই অজুহাতটা রাষ্ট্র খুব পছন্দ করে। কারণ এতে অপরাধীর নাম লাগে না। নুরুর বন্ধুরা জানত, আজ যে চুপ থাকবে, আগামীকাল তার দরজায়ও রাতের শব্দ আসতে পারে। তবু কেউ মুখ খুলেনি। কারণ ভয় শুধু শরীরকে নয়, ভয় মানুষকে ভেতর থেকে যুক্তিবাদী বানিয়ে ফেলে। রাষ্ট্র এই যুক্তিবাদটাই চায়। সে চায় মানুষ ভাবুক— “আমি একা কী-ই বা করতে পারি?” কিন্তু ইতিহাস বলে, সব পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল ঠিক এই প্রশ্নের পরেই। নুরুর মৃত্যুর দশ দিন পর শহরের এক কোণায়, একটি পরিত্যক্ত ঘ...

১৮ টি বুলেটের পরে | অধ্যায় ৩ : রাষ্ট্র যখন নীরব চরিত্র

 ১৮ টি বুলেটের পরে   (অধ্যায় ৩) এস এফ সেলিম আহম্মেদ   কবি, লেখক ও গবেষক। মূল অংশ: রাত নামলেই শহরটা অন্য রকম হয়ে ওঠে।   দিনের আলোয় যে শহর কথা বলে, রাতে সে শহর চুপ করে যায়।   এই চুপ করে যাওয়ার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দগুলো। অধ্যায় দুইয়ের সেই রাত—   ১৩ ঘণ্টার নির্যাতন, বাঁধা চোখ, বাঁধা হাত, আর একটি নদীর পাড়ে পড়ে থাকা নিথর শরীর—   সবকিছু যেন শহরের স্মৃতিতে জমে আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের স্মৃতিতে নেই। রাষ্ট্র স্মৃতি রাখতে চায় না।   রাষ্ট্র কেবল ফাইল বানায়, রিপোর্ট লেখে, শিরোনাম ঠিক করে।   মানুষের জীবন সেখানে একটি প্যারাগ্রাফ,   আর মৃত্যু একটি সাবহেডিং। নুরু মারা যাওয়ার পরের সকালটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিল।   পাখি ডেকেছিল, দোকান খুলেছিল, বাস চলেছিল।   শুধু একটি বাড়িতে কেউ কথা বলেনি। নুরুর মা সকাল থেকে বারান্দায় বসে ছিলেন।   তিনি জানতেন, আজ কিছু একটা ঘটবে।   গত রাতের ঘুম না হওয়া চোখে তিনি বারবার রাস্তার দিকে তাকিয়েছেন।   কিন্ত...

১৮ | নুরুর ১৮ ঘণ্টার নীরবতা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। (অধ্যায় ২)

 ১৮ টি বুলেটের পরে লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ অধ্যায় ২ : ১৮ নুরুল আলম নুরু তখনও মাইক্রোবাসের অন্ধকারে ঘুমের মতো অচেতন।   চোখে বাঁধা কাপড়, মুখে অদ্ভুত ভার—কিছু বুঝতে পারছে না, শুধু শ্বাস নেওয়া হচ্ছে।   গাড়ির ভিতরে থাকা মানুষগুলো কোনো শব্দ করছেন না।   নুরু বুঝতে পারছিল, তাদের চোখে অদৃশ্য এক ধরণের দৃঢ়তার আভা।   এই দৃঢ়তা ছিল রাষ্ট্রের—যে রাষ্ট্র যা কখনো প্রশ্ন করে না, শুধু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে।   গাড়িটি চলতে থাকে, কিন্তু খুব দ্রুত নয়।   প্রতি বাঁক, প্রতি পিচ্ছিল রাস্তা, প্রতিটি ইঞ্জিনের কম্পন—সবই নুরুর ঘুম ভাঙার চেষ্টা করছে।   কিন্তু চোখে বাঁধা কাপড়ের নিচে কিছুই দেখা যায় না।   শুধু কল্পনা।   প্রতিটি শব্দ তার ভেতর আতঙ্কের আগুন জ্বালায়।   কল্পনা করে—কী হতে পারে, কোথায় তাকে নিয়ে যাবে, কি হবে তার শরীরের সঙ্গে।   গাড়ি থেমে।   নুরু টেনে নেমে যায়।   পায়ের নিচে কংক্রিট, দূরে দূরে অন্ধকার।   শহরের শব্দও শোনা যায় না।   এই নীরবতা ভয়কে দ...

১৮ টি বুলেটের পরে | রাষ্ট্রীয় নীরবতায় নিহত মানুষের গল্প। অধ্যায় -১(প- ১,২)

  ১৮ টি বুলেটের পরে এস এফ সেলিম আহম্মেদ অধ্যায় ১ (প-১) : ২৯ মার্চ ২০১৭ | রাত ১১টা ৪৫ রাত ১১টা ৪৫ মিনিট—সময়টা এমন, যখন শহর ঘুমিয়ে পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগরীর চন্দনপুর এলাকার ওই সরু গলিটায় আলো ছিল, কিন্তু আলোয় প্রাণ ছিল না। স্ট্রিটলাইটের নিচে পড়ে থাকা ছায়াগুলোও যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল। এই শহর বহু রাত দেখেছে, বহু শব্দ শুনেছে, কিন্তু কিছু কিছু রাত থাকে—যে রাতে শব্দের চেয়ে নীরবতা বেশি ভয়ংকর। নুরুল আলম নুরু তখন গভীর ঘুমে। দিনভর রাজনৈতিক কাজ, মানুষের সঙ্গে কথা, ফোন, ছোট ছোট সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে শরীর ক্লান্ত ছিল। এই ক্লান্তি তাকে নির্ভার করেছিল। সে জানত না, আজকের রাতে রাষ্ট্র তার দরজায় কড়া নাড়বে। ঘরের ভেতর ফ্যান ঘুরছিল। একঘেয়ে শব্দ। এই শব্দটাই পরে ভাগ্নে রাশেদুল ইসলামের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসবে। কারণ, এই ফ্যানের শব্দের মাঝেই বাড়ির বাইরে এসে থেমেছিল একটি সাদা মাইক্রোবাস। মাইক্রোবাসটির নম্বর প্লেট চোখে পড়ার মতো কিছু ছিল না। কোনো উচ্চ শব্দে ব্রেক কষেনি। ইঞ্জিন বন্ধ করার সময়ও এমনভাবে করা হয়েছিল, যেন কেউ টের না পায়। এই কাজ যারা করে, তারা জানে— ...

ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৬ – শেষ পর্ব)

  ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৬ – শেষ পর্ব) — এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক সকাল হয়েছে। ভোটের দিন শেষ, কিন্তু ভোট শেষ হয়নি। শহরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত। যেন গত রাতের রক্ত, আগুন আর কান্না সবই ছিল কোনো খারাপ স্বপ্ন। ভোটকেন্দ্রের সামনে লাইন ছোট। কিন্তু দেয়ালে দেয়ালে ভয় এখনও লম্বা। ময়নুল খুব ভোরে ঘর ছেড়েছে। সিফাতের রক্ত শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তার কাগজ এখনো ভেজা— ঘামে, আতঙ্কে, দায়িত্বে। ভোটকেন্দ্রে ঢোকার আগে ময়নুল একবার পেছনে তাকায়। এই শহর তাকে অনেক কিছু দিয়েছে— ভাষা, পেশা, মানুষ। আজ এই শহরের কাছেই তার শেষ ঋণ শোধ করার দিন। ভোট চলছে। কাগজে কাগজে সিল পড়ছে, কিন্তু মানুষ কম। এক বুথের কোণে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত কাঁপছে। সে ফিসফিস করে বলে, “কাল রাতে আমার ছেলে পালিয়েছে। আমি ভোট দিতে এসেছি… সে যেন বৃথা না যায়।” ময়নুল কিছু বলে না। এই দেশে এখন কথা কম, নীরবতার দাম বেশি। দুপুরের দিকে ফলাফলের গুঞ্জন শুরু হয়। যারা ...

ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৫)

  ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৫) — এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক এই রাতটা অন্য সব রাতের মতো নয়। এই রাতটা ভোটের আগের শেষ রাত— যে রাতে শহর ঠিক করে নেয়, সে আগামীকাল মানুষ থাকবে, নাকি কেবল সংখ্যা হয়ে যাবে। ময়নুল জানে, সকাল পর্যন্ত কেউ ঘুমোতে পারবে না। কারণ ভয় আজ আর গুজব নয়— ভয় আজ তালিকাভুক্ত। ভয়ের তালিকা এখন মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে না, কিন্তু মানুষের চোখে চোখে। যার চোখে চোখ পড়ে, সে-ই বুঝে যায়— আজ তার নাম আছে কি না। সিফাত সারাদিন ঘরের ভেতর বসে নোট লিখেছে। সে জানে, এই নোট প্রকাশ পেলে সে বাঁচবে না। কিন্তু সে-ও জানে— এই নোট না লিখলে আর কেউ বাঁচবে না। রাত আটটার দিকে প্রথম খবর আসে— দক্ষিণ পাড়ায় এক যুবককে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। তার অপরাধ? সে নাকি বলেছিল— “ভোট দেব।” ভোট দেওয়া এখন মতামত নয়, এটা ঘোষণা। আর ঘোষণা মানেই শাস্তি। ময়নুল ঘর থেকে বের হয়। স্ত্রী কিছু বলতে গিয়েও বলে না। এই শহরে এখন বিদায় বলতে নেই— কারণ বিদায় ম...

ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৪)

  ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৪) — এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক ভোরের আলো ফোটার আগেই শহর জেগে ওঠে। কিন্তু এই জাগরণ কোনো আশার নয়—এটা আতঙ্কের। সিফাত সারারাত ময়নুলের ঘরে বসে ছিল। এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু কথাগুলো ঠান্ডা হয়নি। সে টেবিলের ওপর একটি ভাঁজ করা কাগজ রাখে। “এটাই সেই তালিকা,” সিফাত ফিসফিস করে বলে। “ওরা একে বলে—ঝুঁকিপূর্ণ ভোটার।” ময়নুল কাগজ খুলে দেখে। নাম, ঠিকানা, পেশা—সব লেখা। শিক্ষক। সাংবাদিক। দোকানদার। ছাত্র। যারা প্রশ্ন করে—তারাই ঝুঁকি। এই তালিকা ভোট জেতার নয়, এই তালিকা ভয় জেতার। সিফাত জানায়, তালিকাটি তৈরি হয়েছে দলীয় কার্যালয়ে নয়— উপজেলা প্রশাসনের ভেতরেই। ক্ষমতার উন্মত্ত জবান এবার কলম ধরেছে। সকাল হতেই শহরে গুজব ছড়ায়— “যাদের নাম তালিকায় আছে, তারা নাকি দেশদ্রোহী।” দেশদ্রোহী শব্দটা এখানে খুব সহজ। কারণ প্রমাণ লাগে না। শীলা তার দোকান খুলতেই দুজন যুবক আসে। নাম জিজ্ঞেস করে। ভোট কাকে দেবে জানতে চায়। সে উত্তর না দিতেই...

ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৩)

  ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৩) — এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক শহর ঘুমায়নি। শহর শুধু চোখ বন্ধ করে ছিল। ভোটের মাঠে যে যুবকটি মারা গেছে, তার নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। নাম ঘোষণা মানে দায়িত্ব—আর দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না। ময়নুল সকালবেলা খবরের কাগজ হাতে নিতেই বুঝে যায়—খুনটা পাতায় নেই। এক কোণে ছোট করে লেখা: “নির্বাচনী সহিংসতায় এক ব্যক্তি আহত।” আহত! মৃত মানুষও এখানে আহত হয়ে যায়। সে ছেলেটার মা থানায় গিয়েছিল। ফিরে এসে শুধু বলেছে— “আমাকে বলা হয়েছে, বেশি কথা বললে ছেলের লাশও পাব না।” ক্ষমতার উন্মত্ত জবান এখন আর শুধু নেতাদের মুখে নয়— এটা পুলিশের নোটবুকে, প্রশাসনের ফাইলে, আর নীরবতার শব্দে। সিফাত নিখোঁজ। কাল রাত থেকে তার ফোন বন্ধ। ভাঙা ক্যামেরাটা বাসায় পড়ে আছে, কিন্তু মানুষটা নেই। ময়নুল বুঝে যায়— এই শহরে এখন সত্যের ওজন বেশি হয়ে গেছে। ভোটের প্রস্তুতির মিটিং বসে। উপজেলা অফিসে নেতারা বসে হাসে, চা খায়। রুবেল বলে, “দুই-একটা ঘটনা হলে কিছু...

ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ২)

  ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ২) — এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক পর্ব একের ঘটনার পর শহর আর আগের মতো নেই। ভোরের আলো ফুটলেও মানুষের চোখে আলো নেই—আছে শঙ্কা, অবিশ্বাস আর জমে থাকা রাগ। ময়নুল ঘুম ভাঙতেই মোবাইল হাতে নিল। একের পর এক মিসড কল। রাতভর শহরের দক্ষিণ প্রান্তে সংঘর্ষ হয়েছে। পোস্টার ছেঁড়া থেকে শুরু হয়ে আগুন, তারপর রড, ছুরি—শেষে রক্ত। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, ক্ষমতার উন্মত্ত জবান ততই পশুর মতো ধারালো হয়ে ওঠে। রুবেল আজ আর প্রতিশ্রুতির কথা বলে না। তার মাইকে এখন শ্লোগান নয়—হুমকি। “আমাদের বিরোধীরা দেশের শত্রু। ওদের শিক্ষা দিতে হবে!” জনতার ভিড় থেকে কেউ প্রশ্ন করে না। কারণ প্রশ্ন মানেই সন্দেহ, আর সন্দেহ মানেই শত্রু। শহরের মোড়ে মোড়ে চা-স্টলগুলো এখন আর রাজনীতির আড্ডা নয়—এগুলো হয়ে উঠেছে গোপন যুদ্ধঘাঁটি। কেউ লাঠি লুকাচ্ছে বেঞ্চের নিচে, কেউ ব্যাগে ভরে এনেছে কাঁচের বোতল। শীলা আজ দোকান খোলেনি। তার দোকানের সামনে গতরাতে ককটেল ফেটেছে। ভাঙা কাঁচের টুকরো এখনো রাস্তায় ছড়ানো। “ভোট দিতে যাব?”—সে প্রশ্...

ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ১)

  ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ১) — এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক সকাল উঠতেই ময়নুলের মন অস্থির হয়ে উঠল। শহরের প্রধান রাস্তায় চলছে অদ্ভুত উত্তেজনা। পোস্টার ঝুলছে, ব্যানার কাঁপছে, মাইক দিয়ে আওয়াজ হচ্ছে। তিনি জানেন, আজকের দিন কেবল ভোটের নয়, এটি **ক্ষমতার উন্মত্ত জবান**ের পরীক্ষা। রাস্তায় মিছিল চলছে। নেতা রুবেল নিজের দলের লোকজনকে উৎসাহিত করছে। মাইক থেকে উচ্চস্বরে প্রতিশ্রুতি দেয়, জনতা উচ্ছ্বাসিত। অন্যদিকে ফারুক তার বিরোধীদের কাদা ছুড়ে দিচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে। দুই নেতা, দুই দিক, দুই উন্মত্ততা। ময়নুল চোখ রাখে জনতার দিকে। শিশুদের চোখে কৌতূহল, বৃদ্ধদের চোখে আতঙ্ক। মানুষ বিভ্রান্ত। কোথায় বিশ্বাস, কোথায় ভয়—সবই মিলিয়ে গেছে এক অদ্ভুত উত্তেজনায়। ময়নুল মনে মনে ভাবছে, “ভোটের মাঠ কখনো এত স্পষ্ট হয়নি।” শীলা, স্থানীয় দোকানদারী, দোকান বন্ধ করে বলল, "পাঁচ বছর আগে নেতারা যা বলেছিল, আজও কি কিছু পরিবর্তন হয়েছে?" ময়নুল চুপচাপ মাথা নেড়ে জানায়, "আমরা দায়িত্ব পালন করব।" রাস্তা জুড়ে পোস্টার উড়ছে। ব্যানার কাঁপছে। একজন যুবক হঠাৎ পোস...

ভোটের মাঠে মিথ্যা আশ্বাস

  ভোটের মাঠে মিথ্যা আশ্বাস — কবি: এস এফ সেলিম আহম্মেদ ভোট এলেই নেতা বলে, “ভাই, আমি আছি পাশে,” পাঁচ বছর খুঁজে পাওয়া যায় না—গুগলেও না আসে! রাস্তাঘাট হবে সোনা, নদী পাবে বাঁধ, ভোট শেষে রাস্তায় থাকে শুধু হাঁটু জল আর কাঁদ। চাকরি দেবে লাখ লাখ, যুবক হবে রাজা, ভোট শেষে যুবক বসে—চায়ের দোকান সাজা। কৃষক বললে ধানের দাম, নেতা বলে “দেখবো,” ভোট শেষে ধান বেচে কৃষক—নিজের চোখই ঢাকবো। স্কুল হবে মডেল নাকি, হাসপাতাল হবে ফাইভ, ভোট শেষে প্রেসক্রিপশনে—“ঢাকায় নিয়ে যান, লাইভ।” মঞ্চে উঠে শপথ নেয়, বুক ফুলিয়ে হাঁকে, ভোট শেষে জনগণ দেখে—চেয়ারটা শুধু ডাকে। হাত মেলায়, ছবি তোলে, বলে “আপন লোক,” ভোট শেষে সেই আপন লোক—হয়ে যায় ব্লক। ভাঙা সেতু, ভাঙা বাঁধ, ভাঙা জনতার মন, ভোটে শুধু বদল হয়—নেতার নাম আর নম্বরটন। মাইক কাঁপে, মিথ্যা নাচে, উন্নয়নের গান, পাঁচ বছর পর সেই গান—রিমিক্স ছাড়া আর কী জান! ভোট মানে উৎসব নাকি, পোস্টার আর মিছিল, ভোট শেষে উৎসব থাকে—শুধু ক্ষমতার দালাল নিখিল। ঘরে ঢুকে বলে নেতা, “আপনার দুঃখ বুঝি,” ভোট শেষে দুঃখ বোঝে—শুধু বিদ্যুৎ বিল বুঝি। গণতন্ত...

হ্যাঁ—জনতার রায়: গণভোট ২০২৬ ও নতুন বাংলাদেশের আহ্বান

  হ্যাঁ—জনতার রায় — এস এফ সেলিম আহম্মেদ ভোট মানে ভয় নয়, ভোট মানে আগুন, অন্যায়ের বুকে জ্বলে ওঠা শপথের কুণ্ডলুন। মিথ্যার দেয়াল ভাঙার দিন আজ, একটি শব্দই যথেষ্ট— হ্যাঁ , বজ্রকণ্ঠের আওয়াজ! কলম উঠুক, হাত কাঁপবে না আর, জনতার রায়ে কাঁপুক ক্ষমতার দরবার। চুরি, চক্রান্ত, অন্ধকারের শাসন— আজই হোক ইতিহাস, আজই হোক অবসান। গণভোট মানে প্রশ্নের জবাব, দাসত্ব নয়—এ স্বাধীনতার দাব। নতুন সংবিধান, নতুন বাংলাদেশ, হ্যাঁ -তেই লেখা আগামীর স্পষ্ট নির্দেশ। যুবকের চোখে আগুন, মায়ের বুকে আশা, কৃষকের ঘামে ভেজা নতুন ভরসা। হ্যাঁ বললেই বদলে যাবে দৃশ্যপট, জনগণই মালিক—এটাই চূড়ান্ত ভোট। চলো একসাথে বলি, দ্বিধাহীন কণ্ঠে, হ্যাঁ মানে ন্যায়, হ্যাঁ মানে মুক্তি স্পষ্টে। বারো ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের দিন, হ্যাঁ -তেই জিতবে বাংলাদেশ—এ জনতার শপথচিহ্ন। আর কতকাল নীরব থাকবে রাজপথ, আর কতকাল চাপা পড়বে সত্যের শব্দ? আজ কলম নয়, আজ অস্ত্র ভোট, হ্যাঁ -তেই ভাঙবে স্বৈরাচারের কোট। যে রাষ্ট্র মানুষ ভুলে ক্ষমতাকে পূজে, সে রাষ্ট্র ভাঙে—ইতিহাস নিজেই বুঝে। হ্যাঁ ...

দ্রোহ : শাসনের অন্ধকারে মানুষের আলোকিত অস্বীকার

 দ্রোহ : শাসনের অন্ধকারে মানুষের আলোকিত অস্বীকার লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ   কবি, লেখক ও গবেষক প্রস্তাবনা মানুষ জন্মগতভাবেই অনুগত নয়; মানুষ জন্মগতভাবে প্রশ্নবোধক। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে যখনই ক্ষমতা প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করেছে, তখনই জন্ম নিয়েছে দ্রোহ। দ্রোহ কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ নয়—এটি দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙার ভাষা। এটি উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, বরং বিবেকের সংগঠিত অস্বীকার। শাসকরা প্রায়ই দ্রোহকে বিশৃঙ্খলা বলে চিহ্নিত করে, কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে—সব বিশৃঙ্খলাই ধ্বংসাত্মক নয়; কিছু বিশৃঙ্খলা সভ্যতার পুনর্জন্ম ঘটায়। দ্রোহ সেই অনিবার্য অস্বস্তি, যা সমাজকে তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। দ্রোহের নৈতিক জন্মভূমি দ্রোহের উৎপত্তি ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ক্ষমতা যখন ন্যায় থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার বৈধতা ক্ষয় হতে শুরু করে। এই ক্ষয় থেকেই জন্ম নেয় দ্রোহের নৈতিকতা। গ্রিক সভ্যতায় সক্রেটিস রাষ্ট্রের আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি শক্তি দিয়ে, দাঁড়িয়েছিলেন যুক্তি দিয়ে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—আইন কি সর্বদা ন্যায়সঙ্গত? তাঁর মৃত্যুদণ্ড আসলে ছিল এক রাষ্ট্রের আত্মরক্ষামূলক আতঙ্ক। সক্রেটিস...

শুভেচ্ছার দিনলিপি

শুভেচ্ছার দিনলিপি লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ ২৩ জানুয়ারি— আজকের এই দিনে ভেসে আসে কত স্বর, ফেসবুকের নীল আকাশে শুভেচ্ছার আলোর ঢল। হোয়াটসঅ্যাপের সবুজ পথে ভালোবাসা হেঁটে আসে, দূরের মানুষও আজ হয়ে ওঠে খুবই কাছে। একটি মাত্র বাক্য— “শুভ জন্মদিন, সেলিম”— হয়ে যায় আশীর্বাদ, হয়ে যায় জীবনের ঋণ। কারও স্মৃতির গন্ধ মাখা কথা, কারও নীরব প্রার্থনা, সব মিলিয়ে আজ আমার পথচলার প্রেরণা। আমি জানি, শব্দে ধরা যায় না এই মায়ার পরিমাণ, ভালোবাসার এই ঋণ বয়ে চলে আজীবন প্রাণে প্রাণে। বন্ধু, প্রিয়, শুভাকাঙ্ক্ষী— তোমাদের এই স্পর্শে আমার জন্মদিন হয়ে উঠেছে বিশ্বাসের উৎসবে। এস এফ সেলিম আহম্মেদ শুধু একজন মানুষ নয়, তোমাদের ভালোবাসায় আজ আরও দায়িত্বশীল এক নাম। হৃদয়ের গভীর থেকে এইটুকুই জানাই কথা— তোমাদের ভালোবাসাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

এই দেশ তোমার নয় | বিপ্লবী কবিতা

  এই দেশ তোমার নয় লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ এই দেশ তোমার নয়, যদি এই মাটিতে দাঁড়িয়ে তুমি বিদেশি পাসপোর্টে নিজের মুক্তি খোঁজো। এই দেশ তোমার নয়, যদি দেশের রক্তে তোমার সাম্রাজ্য দাঁড়ায়, আর শেষ ঠিকানা হয় অন্য পতাকার নিচে। এই দেশ তোমার নয়, যদি তুমি জনগণের কাঁধে চড়ে ক্ষমতার সিঁড়ি ভাঙো, আর সিঁড়ির চূড়ায় পৌঁছে এই মানুষগুলোকেই পিছনে ফেলে দাও। রাজনীতির মঞ্চে তোমার দেশপ্রেম নাটক, মাইকের সামনে অশ্রু, আর ক্যামেরা বন্ধ হলেই ভিসা ফাইলের হিসাব। তুমি নেতা নও— তুমি জাতির সঙ্গে প্রতারণাকারী। তুমি ভোট চাও এই মাটিতে, কিন্তু বিশ্বাস রাখো না এই রাষ্ট্রে। তুমি শপথ নাও সংবিধানের নামে, আর সেই সংবিধানই প্রতিদিন ছিঁড়ে ফেলো। তুমি বিপ্লবী নও, তুমি সুবিধাবাদী দালাল। তোমার মুখে স্বাধীনতা, কিন্তু মনটা দূতাবাসের লাইনে। তোমার বুকভরা স্লোগান, আর পকেটভরা পালানোর মানচিত্র। তুমি দেশ বানাওনি— তুমি দেশ শুষে খেয়েছো। তুমি বলো—“দেশের জন্য জীবন”, কিন্তু বিপদ এলেই দেশটাকে বোঝা মনে হয়। তখন এই মাটি নয়, বিদেশি আশ্রয়ই হয়ে ওঠে তোমার শেষ...

ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক ২ | দ্রোহ, প্রতিবাদ ও মানুষের পক্ষে একটি কবিতা

 ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক  ২ — এস এফ সেলিম আহম্মেদ ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক—   এই শব্দ আজ স্লোগান নয়,   এ আমার বুকের ভেতর জমে থাকা আগুনের নাম।   এই শব্দে আছে   লাঠিচার্জে ভাঙা পাঁজরের আর্তনাদ,   গুম হয়ে যাওয়া মানুষের মায়ের কান্না,   আর রক্তমাখা রাজপথের ইতিহাস। তোমরা যারা ক্ষমতার মসনদে বসে   জনগণকে পিষে ফেলো,   মুখে উন্নয়নের বুলি আর হাতে লৌহমুষ্টি—   শোনো,   ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।   আজ যে বুটের শব্দে কেঁপে উঠছে নগর,   কাল সেই বুটই হবে তোমাদের গলায় শিকল। তোমরা ভেবেছিলে   ভয় দেখিয়ে মানুষ চুপ থাকবে,   গুলিতে হত্যা করলে স্বপ্ন মরবে।   কিন্তু জানো না—   স্বপ্নকে হত্যা করা যায় না,   স্বপ্ন প্রতিবার মরে গিয়ে   আরও হাজার গুণ শক্ত হয়ে ফিরে আসে। এই দেশ কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়,   এই পতাকা কোনো একদল দালালের নয়।   এই মাটি চাষ করেছে   ক্ষুধার্ত কৃষক,   এই রাস্তায় রক্ত দিয়েছে ...

ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক | দ্রোহ বিপ্লবী কবিতা | এস এফ সেলিম আহম্মেদ

  ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক ✍️ এস এফ সেলিম আহম্মেদ ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক— এই শুধু শ্লোগান নয়, এ আমার হাড়ে-মজ্জায় জমে থাকা অবদমিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। যে শাসন কথা বলে লাঠির ভাষায়, যে ক্ষমতা প্রশ্নকে গুলি করে, যে রাষ্ট্র নাগরিককে দেখে সন্দেহভাজন হিসেবে— তার নাম ইতিহাসে লেখা থাকে রক্তাক্ত কালির অক্ষরে। আমরা দেখেছি— কীভাবে মিথ্যা সত্যের মুখোশ পরে, কীভাবে সংবাদকে শিকল পরানো হয়, কীভাবে বিবেককে বলা হয় “চুপ থাকাই দেশপ্রেম।” ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক— কারণ সে স্কুলের বেঞ্চে ভয় বসায়, ক্লাসরুমে ঢোকে গোয়েন্দার চোখ, শিশুর প্রশ্নেও খোঁজে ষড়যন্ত্র। সে কবিতাকে ডাকে বিপজ্জনক, সে গানকে বলে রাষ্ট্রদ্রোহ, সে ইতিহাসকে বানায় দরবারি দাস, আর ভবিষ্যৎকে— একটি অনুমতির ফাইল। আমরা জানি, ফ্যাসিবাদ বন্দুকেই জন্মায় না— সে জন্মায় চাটুকারের কলমে, নীরব দর্শকের সুবিধাবাদে, আর শিক্ষিত ভীরুতার নিরাপদ নীরবতায়। ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক— কারণ সে নারীকে দেখে নিয়ন্ত্রণের বস্তু, সংখ্যালঘুকে দেখে শত্রু হিসেবে, আর ভিন্নমতকে দেখে রাষ্ট্রের ভাইরাস...

পরিবর্তন চাই (আর নয় নরম কথা)

  পরিবর্তন চাই (আর নয় নরম কথা) ✍ এস এফ সেলিম আহম্মেদ আর নয় নরম কথা, আর নয় ভদ্র প্রতিবাদ— এই দেশে ভদ্রতা মানেই লুটের লাইসেন্স। ক্ষমতা এখানে জন্মসূত্রে, জনগণ শুধু সংখ্যা মাত্র। ভোট আসে, ভোট যায়— শাসক বদলায় না, মুখ বদলায়। সংবিধান এখন শোকজ নোটিশ, আইন চলে দলীয় ইশারায়। সত্য বললেই দেশদ্রোহী, চোর বললেই দেশপ্রেমিক! শ্রমিকের ঘামে দাঁড়ানো প্রাসাদে মন্ত্রীরা বসে উন্নয়নের গল্প শোনায়। ক্ষুধা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে তার কণ্ঠে লাগানো হয় রাষ্ট্রদ্রোহ। নদী বাঁচে না, মানুষ বাঁচে না, শুধু বাঁচে ক্ষমতার সিংহাসন। লাশের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওদের পায়ের তলায় আর মাটি নেই। এই দেশ কার? যে লুটে নেয় তার? নাকি যে মরে যায় নীরবে তার কোনো অধিকার নেই? আমরা আর আবেদন জানাই না— আমরা ঘোষণা দিচ্ছি। এই শাসন ব্যর্থ, এই ব্যবস্থা অপরাধী। কলম এবার পোস্টার, শব্দ এবার স্লোগান। রাস্তায় নামলে ইতিহাস জানে— ফেরার পথ থাকে না। শোনো ক্ষমতার দালালরা, শোনো নীরব বুদ্ধিজীবীরা— এই জনতার হাঁক উপেক্ষা করলে তোমরাও ইতিহাসের আ...

পরিবর্তন চাই

 পরিবর্তন চাই এস এফ সেলিম আহম্মেদ  আর কতকাল চুপ থাকব বলো? আর কতকাল শিকল পরেই হাঁটব? শব্দগুলো আজ আগুন হয়ে উঠেছে, নীরবতা ভেঙে পথে নামার ডাক। ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে প্রশ্ন জ্বলে, মায়ের বুক ভরা হাহাকার— এ দেশ কি শুধু ক্ষমতাবানের? নাকি আমার, তোমার, আমাদের? ভোটের বাক্সে বন্দি গণতন্ত্র, সত্য কথা আজ অপরাধ— মিথ্যার রাজ্যে সত্যবাদী হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ। নদী ভাঙে, ঘর ভাঙে, স্বপ্ন ভাঙে, তবু ভাঙে না শাসকের অহংকার। পথের ধুলোয় লেখা ইতিহাস মুছে দেয় কাগুজে উন্নয়নের প্রচার। আমি কবি, কলমই আমার অস্ত্র— এই কলমেই লিখি প্রতিরোধ। একটি শব্দই যথেষ্ট কখনো একটি শাসন বদলে দেওয়ার জন্য। আজ আর নয় আপস, নয় ভয়, নয় মিথ্যা আশ্বাসের রাজনীতি। মাটির মানুষ জেগে উঠেছে— এই জাগরণ থামানো যাবে না। শোনো ক্ষমতার মিনারগুলো, ভিত নড়ছে, দেয়াল কাঁপছে— কারণ আমরা একসাথে বলছি, পরিবর্তন চাই—পরিবর্তন চাই!

রুচি: ক্ষমতার ভদ্র মুখোশের বিরুদ্ধে একটি কবিতা

 রুচি   এস এফ সেলিম আহম্মেদ   এই রাষ্ট্রের একটা রুচি আছে—   সে রুচি খুন করে   হাসতে হাসতে।   সে রুচিতে   রক্ত শুকালে তবেই সংবাদ,   লাশ গুনলে তবেই পরিসংখ্যান,   আর মানুষ মরলে   “পরিস্থিতি স্বাভাবিক”।   তোমাদের রুচিতে   ক্ষুধা রাষ্ট্রবিরোধী,   প্রশ্ন ষড়যন্ত্র,   আর প্রতিবাদ—   জাতির শত্রু।   তোমাদের রুচি খুব সভ্য,   সে রুচিতে   চুরি হয় নীতির ভেতর দিয়ে,   লুট হয় আইন দেখিয়ে,   আর দমন চলে   সংবিধানের কোট পরে।   এই রুচি শেখায়—   কীভাবে মুখ বন্ধ রেখে   উন্নয়ন দেখতে হয়,   কীভাবে মরেও   কৃতজ্ঞ থাকতে হয়।   রুচির জন্যই   মা সন্তানের লাশ পায় না,   রুচির জন্যই   নদীকে বলা হয় প্রকল্প,   রুচির জন্যই   মানুষকে বানানো হয়   সংখ্যা, ভোট, উপাত্ত।   তোমাদের রুচিতে...

দুয়ার | রাজনৈতিক কবিতা

  দুয়ার এস এফ সেলিম আহম্মেদ এই দুয়ারটা কাঠের না, লোহারও না— এই দুয়ার বানানো হয়েছে ভয়, ক্ষুধা আর মিথ্যার পেরেক দিয়ে। এই দুয়ারে কড়া নাড়ে না সবাই, কেউ কেউ জন্ম থেকেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতরে আলো— বাইরে কেবল প্রতীক্ষা আর দীর্ঘশ্বাস। ক্ষমতার পাহারায় থাকা দুয়ারগুলো খোলে শুধু পরিচয়ে, খোলে শুধু দলের কার্ডে, খোলে শুধু সেইসব কণ্ঠে যারা প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে। জনতার জন্য খোলা দুয়ার— ঘোষণায় থাকে, মিছিলে থাকে, ইশতেহারে থাকে— কিন্তু বাস্তবে সে দুয়ার সবসময়ই তালাবদ্ধ। যে দুয়ার দিয়ে ঢোকে নির্যাতনের আদেশ, বেরোয় না কোনো জবাবদিহি। যে দুয়ার দিয়ে ঢোকে লুটের টাকা, বেরোয় না ন্যায়ের হিসাব। তবু ইতিহাস বলে— সব দুয়ার চিরদিন বন্ধ থাকে না। একদিন ভাঙা কণ্ঠ, ক্ষুধার্ত হাত আর প্রতিবাদের পা একসঙ্গে ঠেলে দেয় সেই দুয়ার। সেদিন দুয়ার খুলবে কারও দয়ায় নয়— খুলবে মানুষের অধিকারে।

বিশ্বাসের আগুন : যে ভাবনা পোড়ে না

  বিশ্বাসের আগুন লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ বিশ্বাস বইয়ে থাকে না, বিশ্বাস থাকে শিরার ভেতর, চেতনায় গেঁথে থাকে অদৃশ্য অক্ষরে— যে অক্ষর আগুনে পোড়ে না, যে শব্দ ধোঁয়া হয়ে উড়ে যায় না। বই তো কেবল কাগজের শরীর, ভাবনাগুলো তার আত্মা। শরীর পুড়লে আত্মা কি মরে? না— আত্মা মানুষের ভেতর আশ্রয় নেয়, মানুষ থেকে মানুষে নীরবে যাত্রা করে। তুমি বই পুড়াও, তোমার ভয়কে আগুন দাও— কিন্তু ভয় জানে না বিশ্বাস কোথায় লুকিয়ে থাকে। বিশ্বাস লুকিয়ে থাকে মায়ের দোয়ায়, শিশুর প্রশ্নে, নির্যাতিত মানুষের নীরব চোখে। বিষাক্ত চিন্তা যদি জন্মায়, তা কাগজে জন্মায় না— তা জন্মায় চেতনায়। আর যদি তার নির্যাস শুকাতে না দাও, তবে হাজার বই পুড়িয়েও একটি ভাবনাকেও হত্যা করা যাবে না। আগুন বড়জোর পাতার রং বদলাতে পারে, কালোকে ছাই করতে পারে— কিন্তু যুক্তিকে নয়, বিশ্বাসকে নয়। আমরা শত্রুর চিন্তাকেও সহজে বিষ বলি না। কারণ যারা যুক্তিকে ভয় পায়, তারাই আগুন হাতে তোলে। আমরা আগুন তুলি না, আমরা প্রশ্ন তুলি, যুক্তি তুলি, বিশ্বাস ...

ভয় : নীরবতার রাজনীতি ও মানুষের আত্মসংগ্রাম

 ভয় লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ ভয় আসে শব্দহীন, পায়ের শব্দ নেই— তবু ঘরের সব দরজা সে জানে। ভয় কখনো মুখোশ পরে আসে, কখনো আসে পরিচিত মানুষের হাসিতে, কখনো রাষ্ট্রের সিল মারা নোটিশে, কখনো বা প্রেমিকার “সব ঠিক আছে” বলা নীরবতায়। আমরা ভয়কে ছোট করে ভাবি, বলতে চাই— এ তো সাময়িক, এ তো কেটে যাবে। কিন্তু ভয় ধৈর্যশীল, সে অপেক্ষা করতে জানে। সে চেয়ারে বসে না, সে মানুষের ভেতর বসে থাকে। ভয় আমাদের শেখায়— কখন চুপ থাকতে হবে, কখন চোখ নামিয়ে হাঁটতে হবে, কখন সত্যকে রূপকথা বানিয়ে ফেলতে হবে। একদিন ভয় বই পড়তে শিখে যায়, আরেকদিন ভয় সংবাদ পড়ে। ভয় জানে— কোন শব্দ বিপজ্জনক, কোন প্রশ্ন অপরাধ। আমরা তখন কবিতা লিখি, কিন্তু ভয় শব্দ বেছে দেয়। আমরা কথা বলি, কিন্তু ভয় বাক্য সাজায়। ভয় আমাদের খুব ভদ্র করে তোলে— আমরা কাঁদি নিঃশব্দে, হাসি পরিমিত, রাগ করি গোপনে। ভয় সন্তানকে শেখায় অতিরিক্ত স্বপ্ন দেখতে নেই, ভয় প্রেমিককে বলে অধিক সত্য বলা ঠিক নয়, ভয় নাগরিককে বলে সব প্রশ্নের উত্তর চাইতে নেই। সবচেয়ে ভয়ংকর ভয়টি হলো— আমরা একদিন ভয়কে ভালোবাসতে শিখে যাই। ভয় তখন আর শত্রু নয়, সে হয়ে ওঠে অভ্যাস। আমরা বলি— ...

মন: একটি চলমান আধুনিক কবিতা

 মন কবি: এস এফ সেলিম আহম্মেদ  মন— একটা নীরব নোটিফিকেশন, রাত তিনটার স্ক্রিনে জ্বলে ওঠে কারও নাম না-থাকা আলো। মন— কখনো হাইওয়ে, গতি বাড়ালেই স্মৃতির টোলপ্লাজা, প্রতিটি বুথে একেকটা প্রশ্ন— থামবে, না থামবে? মন জানে, কফির কাপে ঘূর্ণি মানেই গভীরতা, আর গভীরতা মানেই নিজের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া। মন হাঁটে কবিতার লাইনে লাইনে, কমা ফেললে শ্বাস নেয়, ফুলস্টপে একটু মরে, তারপর আবার নতুন অনুচ্ছেদে জন্ম। মন খুব আধুনিক— সে জানে ডিলিট অপশন আছে, তবু কিছু ফাইল আজীবন রিসাইকেল বিনে ঘুমায়। মন ছন্দ ভাঙে, কারণ সব ছন্দই একদিন খাঁচা হয়ে যায়। মন শেষমেশ বলে— আমি কোনো সমাধান নই, আমি প্রশ্নের সুন্দর ফন্ট, অস্থিরতার স্টাইলিশ ভার্সন। মন— একটা চলমান কবিতা, যার কোনো ফাইনাল ড্রাফট নেই।

ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতা ও ছাত্রদল: আত্মসমালোচনা ছাড়া পুনরুত্থান অসম্ভব

ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতা ও ছাত্রদল: আত্মসমালোচনা ছাড়া পুনরুত্থান অসম্ভব লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ   কবি, লেখক ও কলামিস্ট   বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্ররাজনীতি বরাবরই শক্তিশালী একটি চালিকাশক্তি। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে ছাত্রসমাজ ছিল অগ্রভাগে। কিন্তু ইতিহাসের সেই গৌরবময় অধ্যায়ের সঙ্গে আজকের ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতার তুলনা করলে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আজ ছাত্ররাজনীতি সংকটে, ছাত্রসংগঠনগুলো আস্থাহীনতায় ভুগছে, আর ছাত্রসমাজ ক্রমেই রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এই সংকট সবচেয়ে প্রকটভাবে ধরা পড়ছে বিরোধী রাজনীতির ছাত্রসংগঠনগুলোতে—বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে। বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়েই বিচার করা প্রয়োজন। ### পরিচয়ের সংকট: ছাত্রদল নামেই কি ছাত্র? আজ এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে “ছাত্রদল” পরিচয়টি অনেক প্রকৃত শিক্ষার্থীর কাছে গর্বের নয়, বরং অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ নিজেকে ছাত্রদলের কর্মী বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পায়—এটি কল্পনা নয়, বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো,...

অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ : ভণ্ডামি, ক্ষমতা ও সমাজের নীরব ষড়যন্ত্র

 অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ কবি, লেখক ও গবেষক বাংলা প্রবাদ-প্রবচনের ভাণ্ডারে এমন কিছু বাক্য আছে, যেগুলো শুধু কথার কথা নয়—সেগুলো সমাজের গভীর মনস্তত্ত্ব, মানুষের চরিত্র এবং ক্ষমতার আচরণগত সত্যকে অনায়াসে উন্মোচন করে। “অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ”—এই প্রবাদটি তেমনই একটি নির্মম অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা-জাত উক্তি। চারটি শব্দে মানুষের ভেতরের লোভ, ভয়, ষড়যন্ত্র আর ভণ্ডামির এক দীর্ঘ ইতিহাস যেন ধরা পড়ে। ভক্তি নিজেই কোনো দোষের বিষয় নয়। বরং ভক্তি মানুষকে শৃঙ্খলিত করে, শ্রদ্ধাশীল করে, মূল্যবোধ শেখায়। কিন্তু যখন এই ভক্তি সীমা ছাড়িয়ে যায়, যুক্তিকে হত্যা করে, প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করে, তখনই তা হয়ে ওঠে অতি ভক্তি। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় সন্দেহ—এই ভক্তি কি সত্যিই ভক্তি, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো স্বার্থ? ভক্তি ও অতি ভক্তির সূক্ষ্ম সীমারেখা ভক্তি মানে সম্মান। অতি ভক্তি মানে আত্মসমর্পণ। ভক্তি মানে ভালোবাসা। অতি ভক্তি মানে নিজের বিবেক বন্ধক রাখা। ভক্ত মানুষ প্রয়োজনে প্রশ্ন করে, সংশোধনের কথা বলে, ভুল দেখিয়ে দেয়। কিন্তু অতি ভক্ত মানুষ প্রশ্ন করে না—কারণ প্রশ্ন করলে সুবিধা ন...

সত্য কথা: রাজনৈতিক প্রতিবাদের কবিতা | এস এফ সেলিম আহম্মেদ

  সত্য কথা (রাজনৈতিক রূপ) কবি: এস এফ সেলিম আহম্মেদ সত্য কথা বললে এখন ফাইল খোলে, নজরদারি বাড়ে। রাষ্ট্রের চোখ লাল হয়, আর বিবেক হয়ে যায় রাষ্ট্রদ্রোহী। সত্য কথা মানে আজ চাকরি হারানো, মামলা খাওয়া, অথবা এক টুকরো লাশ— খবরের নিচে ছোট হরফে নাম। মিথ্যা এখানে জাতীয় পতাকা ওড়ায়, ভাষণ দেয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে। সত্যকে ডাকা হয় গুজব, আর গুজবই হয় নীতির দলিল। যে সত্য বলে, তার চারপাশে দেয়াল তোলে ভয়। বন্ধ হয় মাইক, খোলা থাকে কেবল হাতকড়া। এখানে ভোট গণনা হয় আগেই, তারপর মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। সত্য কথা তখন ব্যালট বাক্সে ঢোকার আগেই মৃত। তবু কিছু মানুষ আছে— যারা নীরবতা মানে না। তাদের কণ্ঠে সত্য আর সে সত্যই একদিন রাষ্ট্র বদলায়।