পোস্টগুলি

অক্ষরের আকাশগাঁথা | এস এফ সেলিম আহম্মেদ

 অক্ষরের আকাশগাঁথা   এস এফ সেলিম আহম্মেদ   অ আ ক খ—আদি অনন্তের ডাক,   অন্ধকার ভেঙে জ্বলে আলোর ফাঁক।   শূন্যের বুকে শব্দের শিখা,   অক্ষরে জাগে অস্তিত্ব-দীক্ষা।   অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ এ ঐ ও ঔ—   স্বরের সাগরে সুরের নৌ।   হ্রস্ব দীর্ঘ প্রাণের টান,   নিঃশ্বাস জুড়ে মহাগান।   ঋ-তে ঋষির ঋতুচক্র,   ঐ-তে ঐক্য বিশ্বমন্ত্র।   ও-তে ওমের অনুরণন,   ঔ-তে ঔজ্জ্বল্য চিরজাগরণ।   ক খ গ ঘ ঙ—কালের কাব্য,   খোলা আকাশে খুঁজে স্বরাভ্য।   গভীর গানে গোপন রাগ,   ঘূর্ণি ভেঙে জেগে ওঠে ভাগ।   ঙ-এর নীরব নীল উচ্চার,   অন্তঃস্বরের গোপন দ্বার।   চ ছ জ ঝ ঞ—চেতনার চূড়া,   ছায়ায় লেখা জীবনের সুরা।   জাগে জিজ্ঞাসা ঝলক-ঝরে,   জ্ঞানের ঢেউ অন্তরে ভরে।   ঞ-এর কোলে নীরব ধ্যান,   অদৃশ্য তবু গভীর জ্ঞান।   ট ঠ ড ঢ ণ—মাটির মান,   ঠাঁই দাঁড়ায় ঐতিহ্য প্রাণ। ...

স্বকীয়তার ভাষা | বাংলা ভাষার উৎস, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদার কাব্যিক উচ্চারণ

 স্বকীয়তার ভাষা   এস এফ সেলিম আহম্মেদ   বাংলা কোনো সাম্রাজ্যের অনুবাদ নয়,   কোনো বিজেতার ছায়ালিপি নয়,   কোনো রাজদরবারের দাক্ষিণ্যে পাওয়া নামও নয়—   সে জন্মেছে ধীরে,   সময়ের অদৃশ্য পরীক্ষাগারে,   উপমহাদেশের মাটির গভীর রসায়নে।   প্রাচীন প্রাকৃতের নিঃশ্বাসে   মাগধী অপভ্রংশের রূপান্তরে   লোকজ উপভাষার অশ্রুত সুরে   একটি উচ্চারণ ধীরে ধীরে রক্ত পেল, শরীর পেল,   নাম পেল—বাংলা।   আরবের মরু তখনও দূরে,   ফার্সির অমরাবতী তখনও অচেনা,   এই ভূখণ্ডের মানুষ   মাঠে, ঘাটে, নদীর বাঁকে,   জোৎস্না-ভেজা উঠোনে   নিজেদের ভাষায়ই বলেছে জীবনের কথা।   ভাষা একদিনে জন্মায় না—   তা জন্ম নেয় ইতিহাসের গর্ভে।   যেমন নদী নিজের পাড় নিজেই গড়ে,   যেমন পলি জমে নতুন ভূমির জন্ম দেয়,   তেমনি ভাষা সময়ের স্তরে স্তরে   নিজস্ব কাঠামো নির্মাণ করে।   সংস্কৃত দিয়েছে শাস...

ইনকিলাব জিন্দাবাদ — এস এফ সেলিম আহম্মেদ

 ইনকিলাব জিন্দাবাদ — এস এফ সেলিম আহম্মেদ অন্ধকারের অট্টহাসি ছিঁড়ে জ্বালো রক্তের শিখা, ভয়ের প্রাচীর ভাঙো আজ, ভেঙে ফেলো সব দীক্ষা, শেকলবন্দী সূর্যটাকে টেনে আনো মুক্ত দিগন্তিকা, বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হোক জাগ্রত জনতার দীক্ষা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ মিথ্যার মুকুট ছুঁড়ে ফেলো আগুনঝরা ঘৃণায়, শোষকের সিংহাসন ডুবাও জনরোষের বন্যায়, অবিচারের অট্টালিকা কাঁপুক তেজের ধ্বনায়, রক্তিম ভোর ছিনিয়ে আনো সংগ্রামেরই গণনায়। ইনকিলাব জিন্দাবাদ আমরা আগ্নেয়গিরি, অন্তরে লাভার ঢেউ, আমরা দুর্বার ঝড়, ভাঙি শৃঙ্খলের নৌ, আমরা তেজস্ক্রিয় সময়, বদলাই ইতিহাসের বৌ, আমরাই লিখি আগুনে আজ মুক্ত ভবিষ্যৎ ঢেউ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ দগ্ধ মাটির বুকের ভেতর দাবানলের জাগরণ, অশ্রু থেকে জন্ম নিক বিদ্রোহী প্রজন্ম-ঘোষণ, অন্যায়ের প্রতিটি ইটে হোক ক্রোধের বিস্ফোরণ, শপথ নাও—ভাঙব আজ শোষণের প্রতিরোধ-গঠন। ইনকিলাব জিন্দাবাদ যে কণ্ঠ চেপে ধরেছিল ভীতির কালো হাত, সে কণ্ঠ আজ বজ্র হয়ে দিক দিগন্তে আঘাত, যে চোখে নামিয়েছিল লজ্জার অশ্রুপাতে রাত, সে চোখেই জ্বলে উঠুক বিপ্লবী প্রভাত। ইনকিলাব জিন্দাবাদ পথ যদি রক্তে রাঙে, তবু থামবে না পদচিহ্ন, পতাকা যদি পুড়...

আঁধার | হারিয়ে যাওয়া প্রেমের আবৃত্তিযোগ্য হৃদয়ভাঙা কবিতা | এস এফ সেলিম আহম্মেদ

 আঁধার   — এস এফ সেলিম আহম্মেদ   ধীরে…   আরও ধীরে নামুক সন্ধ্যা—   আজ তাড়াহুড়ো কোরো না।   আজ আমি স্মৃতির কাছে বসতে চাই।   তুমি চলে যাওয়ার দিন   আকাশে রোদ ছিল অস্বাভাবিক উজ্জ্বল,   মানুষজন ব্যস্ত ছিল নিজেদের জীবনে,   শুধু আমার ভেতরে   কেউ একজন চুপচাপ দরজা বন্ধ করে দিল।   শব্দ হয়নি।   কোনো ঝড় ওঠেনি।   শুধু নিঃশব্দে   একটি জীবন থেকে আরেকটি জীবন   সরে গিয়েছিল।   মনে আছে—   শেষবার তুমি যখন বললে,   “ভালো থেকো…”   শব্দ দুটি খুব ছোট ছিল,   কিন্তু তার ভেতরে ছিল   এক সমুদ্র বিদায়।   আমি তখনও বুঝিনি—   ভালো থাকা কত কঠিন শব্দ।   রাতগুলো এখন দীর্ঘ হয়,   অস্বাভাবিক দীর্ঘ।   ঘড়ির কাঁটা এগোয়,   কিন্তু সময় দাঁড়িয়ে থাকে   সেই বিকেলের দরজায়।   আমি চোখ বন্ধ করলে দেখি—   তুমি হাঁটছো দূরে, ...

মাতৃ ভাষা | রক্তে লেখা একুশ

 মাতৃ ভাষা   — এস এফ সেলিম আহম্মেদ   একুশের ভোর মানেই—   কুয়াশার ভেতর লাল এক সূর্য উঠে দাঁড়ায়।   রক্তে ভেজা ইতিহাস   আবারও দরজায় কড়া নাড়ে—   বলতে চায়,   “ভুলে যেও না…”   আমি যখন “মা” বলি—   এই শব্দ কি শুধু উচ্চারণ?   না, এ তো বুকের গভীর থেকে উঠে আসা   অস্তিত্বের প্রথম স্পন্দন।   এই শব্দেই ছিল প্রথম কান্না,   প্রথম হাসি,   প্রথম পৃথিবী দেখা।   ১৯৫২—   ঢাকার রাজপথে কাঁপছিল তরুণ বুক,   গুলির শব্দ ছিঁড়ে দিচ্ছিল আকাশ।   তবু থামেনি কণ্ঠ—   “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!”   এই উচ্চারণ ছিল বিদ্রোহ,   এই উচ্চারণ ছিল ভালোবাসা,   এই উচ্চারণ ছিল আত্মমর্যাদার আগুন।   সালাম!   বরকত!   রফিক!   জব্বার!   তোমাদের নাম নিলেই   আমার ভেতর কেঁপে ওঠে এক সমুদ্র।   তোমাদের রক্ত শুকিয়ে গেছে রাজপথে,   কিন্তু লাল...

জন্ম দেশ | এস এফ সেলিম আহম্মেদ

 জন্ম দেশ   এস এফ সেলিম আহম্মেদ   আমার জন্ম দেশ বাংলাদেশ—   রক্তের ভেতর যার মানচিত্র আঁকা,   শিরায় শিরায় যার সবুজের স্রোত।   আমি চোখ মেলেছি এই মাটির আলোয়,   প্রথম কান্না মিশেছে ধানের গন্ধে,   প্রথম হাঁটা শিখেছি কাদামাটির উঠোনে।   যে আকাশ আমাকে নীল হতে শিখিয়েছে,   যে নদী আমাকে ভাঙতে ভাঙতে দাঁড়াতে শিখিয়েছে,   সে আকাশ, সে নদী—আমার আত্মীয়।   যমুনার ঢেউয়ের মতোই অস্থির আমার স্বপ্ন,   ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের মতোই জেদি আমার ভালোবাসা।   এই মাটিতে পড়ে আছে আমার শেকড়,   গভীরে, আরও গভীরে—   যেখানে পূর্বপুরুষের নিঃশ্বাস মিশে আছে   ধানের শিষে, কাশফুলে,   শীতের কুয়াশায় আর বর্ষার গর্জনে।   বাংলাদেশ,   তুমি শুধু ভূগোল নও—   তুমি আমার উচ্চারণ,   তুমি আমার ভাষা,   তুমি আমার অনিদ্র রাতের ভেতর জেগে থাকা এক টুকরো আলো,   তুমি ভাঙা স্বপ্নের পরে আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস।...

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

 "রমজান"  — এস এফ সেলিম আহম্মেদ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ একটু নীরবতা নামে, মাগরিবের আজানের সুরে দিনভর ক্লান্ত আকাশটাও যেন সেজে ওঠে আলোয়। রমজান আসে— কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, এটি আসে মানুষের ভেতরে, হৃদয়ের গোপন দরজায় কড়া নেড়ে। ক্ষুধা তখন শুধু শরীরের নয়, আত্মাও খুঁজে ফেরে এক ফোঁটা নির্মলতা। এক গ্লাস পানির মতো সহজ হয়ে যায় সব বড় বড় চাওয়া। এই মাস শেখায়— কম খেয়ে কীভাবে বেশি তৃপ্ত থাকা যায়, কম কথা বলে কীভাবে বেশি অনুভব করা যায়, আর অন্ধকারের মাঝেও কীভাবে নিজের ভেতরে আলো জ্বালাতে হয়। রাতগুলো লম্বা হয়, দোয়ায় ভিজে যায় নিঃশব্দ সময়, চোখের কোনায় জমে থাকা অপরাধবোধ ক্ষমার আশায় আকাশের দিকে তাকায়। রমজান মানে ফিরে আসা— নিজের কাছে, সত্যের কাছে, ভালো মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোর কাছে। যদি বদলাতেই হয়, তবে আজই বদলাই; যদি শুরু করতেই হয়, তবে এই চাঁদের নিচেই করি নতুন প্রতিজ্ঞা। হয়তো পৃথিবী একদিনে বদলাবে না, কিন্তু একটি হৃদয় বদলালেই একটি নতুন ভোর জন্ম নেয়। রমজান— তুমি শুধু একটি মাস নও, তুমি মানুষ হওয়ার সবচেয়ে সুন্দর অনুশীলন।