১৮ টি বুলেটের পরে | অধ্যায় ৫ : সাক্ষ্যের দাম
১৮ টি বুলেটের পরে
(অধ্যায় ৫ : সাক্ষ্যের দাম)
- এস এফ সেলিম আহম্মেদ
মূল অংশ:
সাক্ষ্য কখনো চিৎকার করে না।
সাক্ষ্য দাঁড়িয়ে থাকে।
চুপচাপ।
ঠিক মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে।
নুরুর মৃত্যুর পর যে পাঁচজন মানুষ সেই পরিত্যক্ত ঘরে বসেছিল,
তারা তখনো নিজেদের “সাক্ষী” ভাবেনি।
তারা শুধু ভেবেছিল—ভুলে না যাওয়ার দায়টা নিতে হবে।
এই দায়টাই ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল।
রাষ্ট্র জানে,
প্রতিবাদকারীকে দমন করা যায়,
কিন্তু সাক্ষীকে নিশ্চুপ করা কঠিন।
কারণ সাক্ষী মিথ্যা বলে না,
সে শুধু যা দেখেছে, সেটাই বহন করে।
নুরুর এক বন্ধু—রাশেদ—
প্রথম বুঝতে পারে, কিছু একটা বদলাচ্ছে।
তার ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কল আসতে শুরু করে।
কেউ কথা বলে না।
শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
কখনো হালকা হাসি।
ভয়কে এভাবে পাঠানো হয়।
শব্দ ছাড়াই।
রাশেদ জানত,
এগুলো কাকতাল নয়।
সে নুরুকে তুলে নেওয়ার রাতের দৃশ্য দেখেছিল।
সাদা মাইক্রোবাস।
দরজার শব্দ।
চুপ করে থাকা প্রতিবেশীরা।
রাষ্ট্র সব সময় প্রথমে সাক্ষীকেই খোঁজে।
নুরুর মা একদিন রাশেদকে ডেকে বলেছিলেন—
“বাবা, তুমি যা জানো, মনে রেখো।
বলতে না পারলেও মনে রেখো।
মরে গেলেও মনে রেখো।”
এই কথার ভেতর ছিল এক ধরনের অনুরোধ,
এক ধরনের আদেশ,
আর এক ধরনের শেষ ভরসা।
রাষ্ট্র চায় মানুষ মরুক।
মা চায় স্মৃতি বাঁচুক।
রাশেদ সেই দিন বুঝেছিল—
সাক্ষ্য দেওয়ার মানে শুধু আদালতে কথা বলা না,
সাক্ষ্য মানে বেঁচে থাকা অবস্থাতেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া।
আরেকজন—শহীদ—
নুরুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছিল।
রশির দাগ।
চোখ বাঁধার দাগ।
মুখে গুঁজে দেওয়া কাপড়।
সে জানত,
এটা কোনো “সংঘর্ষ” নয়।
এটা ছিল পাঠ।
কিন্তু পাঠটা কাদের জন্য?
ভোটারদের জন্য?
কর্মীদের জন্য?
নাকি ভবিষ্যতের জন্য?
রাষ্ট্র পাঠ দিতে ভালোবাসে।
কারণ পাঠে প্রশ্ন থাকে না।
এই পাঁচজন মানুষ ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যেতে শুরু করল।
একসাথে থাকাটা বিপজ্জনক।
এখন নীরবতা মানে লুকিয়ে থাকা।
তবুও তাদের ভেতর একটি অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হয়েছিল।
ভয়ের চেয়েও শক্ত।
একে বলে—দোষী না হওয়ার বোধ।
রাষ্ট্র যখন অন্যায় করে,
তখন যারা জানে,
তাদের সামনে দুটি পথ থাকে—
একটা নিরাপদ,
আরেকটা সঠিক।
সঠিক পথটা সবসময় অন্ধকার।
রাশেদ এক রাতে সিদ্ধান্ত নেয়।
সে ডায়েরির পাতায় নুরুর কথা লিখতে শুরু করে।
নাম ছাড়া।
স্থান ছাড়া।
কিন্তু সত্য ছাড়া কিছুই বাদ দেয় না।
লেখা শেষ করে সে কাঁদেনি।
সে জানত, এই কান্না বিলাসিতা।
এখন সময় হিসাবের।
শহীদ meanwhile ঠিক করেছিল,
সে শহর ছাড়বে না।
যদি কিছু ঘটে,
এই শহরই জানবে।
রাষ্ট্র এসব সিদ্ধান্তের শব্দ পায় না।
কিন্তু তার ঘ্রাণ পায়।
ভয়ের ঘ্রাণ।
সত্যের ঘ্রাণ।
এক রাতে নুরুর বাড়ির সামনে আবার গাড়ি থামে।
কেউ নামে না।
কেউ কিছু বলে না।
গাড়িটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর চলে যায়।
এই থেমে যাওয়াটাই বার্তা।
“আমরা জানি।”
নুরুর মা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি কিছু বলেননি।
শুধু চোখ বন্ধ করে বলেছিলেন—
“আল্লাহ, সাক্ষ্য যেন মরে না।”
অধ্যায় পাঁচ এখানেই ভারী হয়ে ওঠে।
কারণ এখন প্রশ্নটা আর “কে মারলো” নয়,
প্রশ্নটা—
“কে বলবে?”
আর যে বলবে,
তার জন্য কী অপেক্ষা করছে?
পরের অধ্যায়ে
এই সাক্ষ্যের দাম
পরিশোধ হতে শুরু করবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন