ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৪)
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৪)
— এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক
ভোরের আলো ফোটার আগেই শহর জেগে ওঠে।
কিন্তু এই জাগরণ কোনো আশার নয়—এটা আতঙ্কের।
সিফাত সারারাত ময়নুলের ঘরে বসে ছিল। এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু কথাগুলো ঠান্ডা হয়নি।
সে টেবিলের ওপর একটি ভাঁজ করা কাগজ রাখে।
“এটাই সেই তালিকা,” সিফাত ফিসফিস করে বলে। “ওরা একে বলে—ঝুঁকিপূর্ণ ভোটার।”
ময়নুল কাগজ খুলে দেখে। নাম, ঠিকানা, পেশা—সব লেখা।
শিক্ষক। সাংবাদিক। দোকানদার। ছাত্র।
যারা প্রশ্ন করে—তারাই ঝুঁকি।
এই তালিকা ভোট জেতার নয়, এই তালিকা ভয় জেতার।
সিফাত জানায়, তালিকাটি তৈরি হয়েছে দলীয় কার্যালয়ে নয়— উপজেলা প্রশাসনের ভেতরেই।
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান এবার কলম ধরেছে।
সকাল হতেই শহরে গুজব ছড়ায়— “যাদের নাম তালিকায় আছে, তারা নাকি দেশদ্রোহী।”
দেশদ্রোহী শব্দটা এখানে খুব সহজ। কারণ প্রমাণ লাগে না।
শীলা তার দোকান খুলতেই দুজন যুবক আসে। নাম জিজ্ঞেস করে। ভোট কাকে দেবে জানতে চায়।
সে উত্তর না দিতেই বলে— “নামটা ঠিকঠাক থাকুক, আপা।”
ভদ্র ভাষা, কিন্তু ভেতরে ছুরি।
দুপুরের দিকে এক অদ্ভুত দৃশ্য। একজন জনপ্রিয় নেতা—যাকে মানুষ ‘ভদ্র’ বলে জানত— মাইকে উঠে ঘোষণা দেয়:
“কিছু লোক গণতন্ত্রের নামে বিশৃঙ্খলা করছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ময়নুল বুঝে যায়— এটাই বিশ্বাসঘাতকতা।
যে নেতা গত সপ্তাহেও ভোটের অধিকার নিয়ে কথা বলেছিল, আজ সে-ই ভয়কে বৈধতা দিচ্ছে।
রাতে প্রথম ‘তালিকা অভিযান’ শুরু হয়।
একটি বাড়িতে হানা। কারণ—সেখানে একজন ভোটার প্রশ্ন করেছিল।
লোকটিকে নেওয়া হয়, কিন্তু থানায় নয়।
কোথায়—তা কেউ জানে না।
এই শহরে এখন নিখোঁজ হওয়া খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু এখানেই গল্প মোড় নেয়।
ভয় এতদিন একমুখী ছিল। আজ প্রথমবার তা থমকে দাঁড়ায়।
কয়েকজন শিক্ষক, কয়েকজন নারী, কয়েকজন শ্রমিক— নীরবে জড়ো হয়।
কোনো মিছিল নয়। কোনো শ্লোগান নয়।
তারা শুধু বলে— “আমরা ভোট দেব।”
এই বাক্যটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ময়নুল সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে—এর পরিণতি ভালো নাও হতে পারে।
কিন্তু সে-ও জানে— এটাই শেষ সুযোগ।
পর্ব চার শেষ হয় এক প্রশ্নে—
ভয় যদি রাষ্ট্রের ভাষা হয়ে যায়, তাহলে নাগরিক কী নিয়ে কথা বলবে?
পর্ব পাঁচে এই প্রশ্নের উত্তর রক্ত দিয়ে লেখা হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন