১৮ | নুরুর ১৮ ঘণ্টার নীরবতা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। (অধ্যায় ২)
১৮ টি বুলেটের পরে
লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ
অধ্যায় ২ : ১৮
নুরুল আলম নুরু তখনও মাইক্রোবাসের অন্ধকারে ঘুমের মতো অচেতন।
চোখে বাঁধা কাপড়, মুখে অদ্ভুত ভার—কিছু বুঝতে পারছে না, শুধু শ্বাস নেওয়া হচ্ছে।
গাড়ির ভিতরে থাকা মানুষগুলো কোনো শব্দ করছেন না।
নুরু বুঝতে পারছিল, তাদের চোখে অদৃশ্য এক ধরণের দৃঢ়তার আভা।
এই দৃঢ়তা ছিল রাষ্ট্রের—যে রাষ্ট্র যা কখনো প্রশ্ন করে না, শুধু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে।
গাড়িটি চলতে থাকে, কিন্তু খুব দ্রুত নয়।
প্রতি বাঁক, প্রতি পিচ্ছিল রাস্তা, প্রতিটি ইঞ্জিনের কম্পন—সবই নুরুর ঘুম ভাঙার চেষ্টা করছে।
কিন্তু চোখে বাঁধা কাপড়ের নিচে কিছুই দেখা যায় না।
শুধু কল্পনা।
প্রতিটি শব্দ তার ভেতর আতঙ্কের আগুন জ্বালায়।
কল্পনা করে—কী হতে পারে, কোথায় তাকে নিয়ে যাবে, কি হবে তার শরীরের সঙ্গে।
গাড়ি থেমে।
নুরু টেনে নেমে যায়।
পায়ের নিচে কংক্রিট, দূরে দূরে অন্ধকার।
শহরের শব্দও শোনা যায় না।
এই নীরবতা ভয়কে দ্বিগুণ করছে।
রাজনীতি, রাষ্ট্র, এবং শক্তি—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত চাপ।
একজন হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে।
নুরু বোঝে—এখানে কোনো আইন নেই।
শুধু নিয়ন্ত্রণ।
শরীর হেলায় না, মাথা না ঘোরায়, চোখ না খুলায়—কিছুই করার সুযোগ নেই।
এটাই রাজনীতির অন্ধকার।
এই ১৮টি বুলেটের আগে, এই রাতটাই প্রথম ধাক্কা।
তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার—নুরুকে একে একে ভেঙে ফেলা।
শারীরিক আঘাত নয়, আত্মার আঘাত।
প্রতিটি দমে মনে হয়, মানুষকে এত সহজে ভেঙে ফেলা যায়।
কেন? কারণ যারা করে তারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি।
এরা জানে, আইন থাকবে, কিন্তু তারা তার সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে।
এরপর প্রথম ধাক্কা আসে।
নুরু পড়তে থাকে।
কিন্তু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক প্রতিক্রিয়া।
একটি ধাক্কা, তারপর আরেকটি।
শরীর কাঁপছে না, আত্মা কাঁপছে।
এই অনুভূতি এত গভীর যে শব্দের কোনো দরকার নেই।
মাইক্রোবাস আবার চলতে থাকে।
নুরুকে অন্য একটি গাড়িতে তোলা হয়।
ফজলে করিমের লোকজন।
নুরু জানে—এই নামগুলো রাজনৈতিক, কিন্তু এখন তারা শারীরিক বাস্তব।
রাজনীতি ও শারীরিক বাস্তব মিলিত হয়েছে।
এবারও লক্ষ্য একই—ভয়, আতঙ্ক, নিয়ন্ত্রণ।
নুরুর মন চলে যায় ২০১৫ সালে জনির ঘটনার দিকে।
তার ভেতরে জেগে ওঠে প্রতিচ্ছবি—স্ত্রী, অন্তঃসত্তা, গর্ভে থাকা সন্তান।
কল্পনা করে—জনির চোখের সামনে কী হয়েছিল, রাষ্ট্রের ১৮টি বুলেট কেমন ছিল।
নুরু বুঝতে পারে, এখন সে সেই গল্পের এক নতুন অংশ।
অন্তর্দৃষ্টি, অতীত এবং বর্তমান—all মিলিয়ে এক ভয়ানক স্রোত।
রাজনীতি এখন আর বিষয় নয়।
এখানে জীবন।
এবং জীবন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্র সব কিছু করতে পারে।
নুরু কল্পনা করে—যদি সে চিৎকার করে, কেউ শোনে না।
যদি সে লড়াই করে, কেউ সাহায্য করে না।
এই অবস্থায় ১৮টি বুলেটের প্রতিফলন কেবল চুপচাপ অপেক্ষা করে।
গাড়ি থেমে।
নুরু টেনে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ছোট ঘরে।
শরীর বাঁধা, চোখে কাপড়, মুখে শান্তি নেই।
এখানে শুধু চাপ।
ধাক্কা। শক্তি। এবং আতঙ্ক।
এটি কোনো প্রশ্নের উত্তর নয়।
শুধু রাষ্ট্রের বাস্তব।
এরপর আসে এক দীর্ঘ সময়।
নুরু বুঝতে পারে—শরীরকে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
কিন্তু আতঙ্কের সঙ্গে মিলিয়ে, আত্মারও পরীক্ষা হচ্ছে।
প্রতিটি মিনিট দীর্ঘ। প্রতিটি সেকেন্ড এক নিঃশ্বাসের মত।
এখন সময় নেই, স্থান নেই।
শুধু এই অন্ধকার, এবং ১৮টি বুলেটের মতো ধাক্কা।
শরীরের আঘাতের পাশাপাশি—মনও কাঁপছে।
যে মানুষটি রাজনীতির মাঠে শক্ত, সেই শক্তি এখন অদৃশ্য।
রাষ্ট্রের সামনে কোনো প্রতিরোধ নেই।
নুরু বুঝতে পারে, এই রাতের শেষে সে আর আগের মতো থাকবে না।
তারপরে প্রথম বুলেটের মতো চাপ আসে।
মাথায় বা শরীরে নয়, আত্মার ওপর।
নুরু বুঝতে পারে—যে রাষ্ট্র এত নিখুঁতভাবে কাজ করে,
তার বিরোধিতা করা কেবল নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করা।
এটি ১৮টি বুলেটের প্রথম ধাপ।
প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি শব্দ—নুরু মনে রাখে।
কারণ রাষ্ট্র সবসময়ই বলে—সব ঠিক আছে।
কিন্তু নুরু জানে, কিছু ঠিক থাকে না।
এটি নির্যাতনের হিসাব। ইতিহাসের দাগ।
একজন মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, পুরো মানবিকতার সঙ্গে ভেঙে ফেলা হয়।
রাজনীতি, ইতিহাস, পরিবার—সব এখন একাকার।
নুরু কল্পনা করে—ভবিষ্যতের শিশুর মুখে তার মুখের অভাব।
নুরু বুঝতে পারে, এই রাত শুধু তার নয়,
একটি রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ।
যেখানে ১৮টি বুলেটের মতো অজানা সংখ্যা গণনা করা হয়।
এখন ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে আসে।
নুরু এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু আগের মতো নয়।
শরীর ঠিক আছে, কিন্তু আত্মা—সেই অন্ধকার থেকে বের হতে চাইছে না।
রাষ্ট্র বলবে—সব ঠিক আছে।
কিন্তু যারা দেখেছে, যারা বেঁচে আছে, তারা জানে—
১৮টি বুলেটের পরে, জীবন আর আগের মতো হয় না।
(কবিতা: ১৮টি ধাপের নীরবতা)
নীরব রাতে গাড়ির শব্দ ভেসে যায়,
চোখে বাঁধা কাপড়, কেউ দেখেনা তার দুঃখের খেলা।
হাত বাঁধা, মুখে কাপড়, শ্বাস শুধু রয়ে যায়,
রাষ্ট্রের চোখে সে কেবল সংখ্যা, জীবন বাঁচে না কেউ।
প্রতিটি ধাক্কা, প্রতিটি চাপ, প্রতিটি নিঃশ্বাস ভয়ানক,
শরীর যেন গ্লাস, ভেঙে পড়তে যাওয়া সহজ।
১৮টি বুলেটের মতো প্রতিটি মুহূর্ত ধারালো,
অতীত আর বর্তমান মিলে যায় এক অন্ধকারে।
মন কাঁপে, আত্মা চিৎকার করে,
কিন্তু কেউ শুনতে পায় না, কেউ রুখতে পারে না।
রাজনীতি আর পরিবার সব একাকার,
শুধু ভয়, শুধু শিকল, শুধু নির্যাতনের বার্তা।
ভোর আসে ধীরে ধীরে, আলো ছোঁয়েও শান্তি দেয় না,
১৮টি ধাপের নীরবতা যেন চিরকাল রয়ে যায়।
মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু আগের মতো নয়,
স্মৃতি, আতঙ্ক, ইতিহাস—সবই তার ভেতরে মিশে।
রাষ্ট্র বলে—সব ঠিক আছে,
কিন্তু সত্যি জানে সে, ১৮টি ধাপের পরে জীবন আর আগের মতো হয় না।
শরীর কাঁপে, কিন্তু আত্মা ভয়েই স্থির,
প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন ধাক্কা দেয়।
নীরবতা কণ্ঠরোধ করে,
এখনও ঘুম ভাঙে না, কেউ শোনে না।
এই রাতের ১৮টি ধাপের ছাপ চিরকাল থাকে,
যেখানে মানুষের কথা, স্বাধীনতা, আশা সব মিলিয়ে যায়।
এই অধ্যায়ের শেষে নুরুকে আবার গাড়িতে তোলা হয়।
নীরবতার মধ্যে, রাষ্ট্রের চোখে,
সে বুঝতে পারে—আজ রাত কেবল একটি ঘটনা নয়।
এটি একটি শিক্ষা।
একটি স্মৃতি।
একটি ভীতিকর ইতিহাস, যা যতক্ষণ পৃথিবীতে থাকবে, ততক্ষণ অমোঘ থাকবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন