আমাদের কমান্ডার: খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক দিকচেতনা

 আমাদের কমান্ডার খালেদা জিয়া


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ক্ষমতার তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা সময়, প্রজন্ম ও চেতনার প্রতীকে রূপ নেয়। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নেতৃত্ব—যাঁকে আলাদা করে বুঝতে কোনো দলীয় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। তিনি ছিলেন আমাদের প্রজন্মের রাজনৈতিক আলোর দিশারী, যাঁর কণ্ঠে জাতি শুনতে পেয়েছিল নিজের ভয়, স্বপ্ন ও প্রত্যয়ের ভাষা।


আমাদের রাজনৈতিক জীবনের এক গভীর বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের মানুষ বরাবরই শাসন, দমন ও আধিপত্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়েছে। পাকিস্তানি শাসনের দীর্ঘ ছায়া পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও, স্বাধীনতার ভেতরের লড়াই শেষ হয়নি কখনোই। সেই প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার আবির্ভাব কেবল একজন রাজনীতিক হিসেবে নয়, বরং এক প্রতিরোধী কণ্ঠ হিসেবে।


১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর তাঁর উচ্চারিত একটি বাক্য—“ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা”—শুধু একটি স্লোগান ছিল না; এটি ছিল একটি প্রজন্মের মনোজগতের প্রতিফলন। এই বাক্যে ছিল শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ছিল আত্মমর্যাদার ঘোষণা, ছিল রাষ্ট্রের স্বাধীন সত্তার প্রতিশ্রুতি।


খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে তাঁর আপসহীনতা। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা—এই তিন প্রশ্নে তিনি ছিলেন দৃঢ়, স্পষ্ট এবং দ্বিধাহীন। রাষ্ট্রীয় বন্ধুত্ব আর রাষ্ট্রীয় আত্মসমর্পণের পার্থক্য তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।


বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি শঙ্কা কাজ করছে—বহিরাগত প্রভাবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হওয়ার ভয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আমরা সেই আশঙ্কার এক ধরনের ‘ড্রেস রিহার্সাল’ দেখেছি। এই প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া ছিলেন ব্যতিক্রম—তিনি রাষ্ট্রচিন্তায় আত্মমর্যাদার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।


তবে নির্মম সত্য হলো, তাঁর দল বহু সময়ই তাঁর নেতৃত্বের নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। ক্ষমতালোভী আমলাতন্ত্র, সুবিধাভোগী রাজনীতিক ও অলিগার্ক শ্রেণি দলকে কলুষিত করেছে। তাঁর সততা ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে।


খালেদা জিয়া রাজনীতি থেকে ধীরে সরে দাঁড়ানোর পর দলীয় দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যে দল একসময় তাঁর নামেই অনুপ্রাণিত হতো, সেই দল আদর্শিক দিকচেতনা হারাতে শুরু করে। আজ প্রশ্ন ওঠে—তাঁর অনুপস্থিতিতে দল কি তার আত্মাকে ধরে রাখতে পেরেছে?


তবু তিনি হারিয়ে যাননি। তিনি আছেন আমাদের রাজনৈতিক স্মৃতিতে, আমাদের চেতনায়। তিনি হয়ে আছেন রাজনৈতিক আকাশের ধ্রুবতারা—যে দিকে তাকিয়ে পথ হারানো মানুষ আবার দিকচেতনা ফিরে পায়।


এই লেখা কোনো অশ্রুবিদায়ের নয়। এটি গর্বের উচ্চারণ। আমরা আমাদের তারুণ্যের কমান্ডারকে বিদায় জানাই—যাঁর নেতৃত্ব আমাদের শিখিয়েছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।


অসীমের পথে আপনার অনন্ত যাত্রা শুভ হোক, কমান্ডার।


লেখক: এস এফ সেলিম আহমেদ  

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

মাতৃ ভাষা | রক্তে লেখা একুশ