**দুই চোরের প্রতিশোধ**

 ## **গল্প: দুই চোরের শেষ অধ্যায়**

একটা সময়ের কথা—উত্তরের এক জনপদ, যেখানে নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট গ্রামটার নাম ছিল দক্ষিণবিল। শান্ত-নিরিবিলি গ্রাম হলেও সেখানে ছিল কিছু মানুষ, যারা শান্তির চেয়ে উত্তেজনাকেই বেশি ভালোবাসতো। সেই গ্রামেরই দুই বিখ্যাত চোর—করিম আর জামাল।  


দুজনেই ছিল নামজাদা। চুরি করতো না অভাবের জন্য, করতো শখের বশে। কিন্তু এটাই তাদের মূল পেশা ছিল না। তাদের আসল কাজ ছিল **মাদক ব্যবসা**। গ্রামের অলিগলিতে থেকে শুরু করে পাশের হাটবাজার পর্যন্ত, তাদের নেশার জাল ছড়িয়ে ছিল নিঃশব্দে।  


প্রথম দিকে করিম ও জামাল ছিল অঙ্গুলিমেয় দুই ভাইয়ের মতো। একসঙ্গে ব্যবসা, একসঙ্গে খাওয়া, আর মাঝে মাঝে মজা করে ছোটখাটো চুরি। মাদক ব্যবসা থেকে দুজনেই বিপুল অর্থ কামিয়েছিল। এলাকায় তাদের নামেই আতঙ্ক, আবার গোপনে কিছু মানুষ তাদের টাকায় আশ্রয়ও পেত।  


কিন্তু মুনাফার হিসেব যখন মনুষ্যতার চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন বন্ধুত্বও টিকতে পারে না।


---


### **বিভেদের শুরু**


একদিনের ঘটনায় তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটে। একটা বড় মাদক চালান আসার কথা ছিল সীমান্ত দিয়ে। কে কত অংশ পাবে, তা নিয়ে শুরু হয় বিবাদ। করিম বলল, “এই চালান আমি এনেছি, আমার ভাগ বেশি হবে।”  


জামাল তখন হেসে বলে, “ভাই, চালান আনতে তো তোমার একার টাকা না। কাজও আমরা দুইজন করেছি। ভাগে ভাগে চলবে।”  


বিতর্ক গড়ায় উত্তপ্ত বাক্যে, তারপর শারীরিক সংঘর্ষেও গিয়ে পৌঁছায়। এক সময় করিম বলে ওঠে—  

“তুই বিশ্বাসঘাতক, জামাল! আজ থেকে তোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই।”  


সেইদিন থেকেই দুই বন্ধুর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলো—যেন আকাশ-পাতাল ফারাক।


---


### **নারী: দুর্বলতার অস্ত্র**


করিমের স্ত্রী, সালমা, ছিল রূপে ও বুদ্ধিতে প্রখর। জামাল জানত, করিম তার স্ত্রীর প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল, আর সালমা জানত—জামালের দুর্বলতা নারী।  


এই দুই দুর্বলতার ফাঁকে শুরু হলো নোংরা এক খেলা।


জামাল প্রথমে সালমার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করলো। বাজারে দেখা হলে এক চিলতে হাসি, ফোনে মাঝে মাঝে বার্তা—“ভাইয়া বাড়ি আছেন?” এমন নিরীহ প্রশ্নের আড়ালে জমতে থাকলো গোপন আগুন।  


করিম কিছু টের পেয়েও চুপ রইল, কারণ সে জানত, সালমা তার দিকেই অনুগত। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঈর্ষা তাকে পুড়িয়ে খাচ্ছিল।  


অন্যদিকে, জামাল সুযোগ বুঝে করিমের ব্যবসার গোপন তথ্য ছড়াতে শুরু করল। কয়েকটা চালান পুলিশের হাতে ধরা পড়লো, আর লোকজন ফিসফাস শুরু করলো—“করিমের দিন শেষ।”  


করিম মান-সম্মান হারিয়ে নিঃশব্দে সরে গেল। দীর্ঘদিন সে ঘরে বসে রইল, লোকচক্ষুর আড়ালে। কিন্তু প্রতিশোধের আগুন ধিকিধিকি জ্বলতে থাকলো তার ভেতরে।


---


### **প্রতিশোধের খেলা**


এক রাতে করিম সালমাকে ডেকে বলল,  

“তুই কি আমার উপর বিশ্বাস রাখিস?”  

সালমা উত্তর দিল, “তুমি যা বলবে তাই করব।”  


করিম বলল, “তাহলে শুন। আজ জামালকে শেষ করতে হবে—তার হাতে যা মান-সম্মান হারিয়েছি, আজ সেটা ফেরত আনব।”  


পরিকল্পনা খুব নিখুঁতভাবে সাজানো হলো। সালমা ফোন করল জামালকে। নরম গলায় বলল,  

“তুমি একদিন বলেছিলে আমাকে দেখতে আসবে। করিম তো এখন শহরে। আজ রাতে আসো না?”  


জামাল প্রথমে একটু ইতস্তত করল, কিন্তু তার পুরোনো দুর্বলতা—নারীর প্রতি লোভ—তাকে অন্ধ করে দিল। রাতের অন্ধকারে সে সালমার ঘরে প্রবেশ করল, স্বপ্নে বিভোর।


কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে—  

বাইরে থেকে করিম ও তার সহযোগীরা দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল। হাতে বাঁশ, রড, লাঠি। জামাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো প্রচণ্ড মারধর।  


চিৎকার করে করিম বলল,  

“চুরি করতে এসেছিলি আমার ঘরে! এখন এলাকার সবাই জানবে তুই একটা চোর!”  


---


### **অপবাদ আর পরিণতি**


পরদিন ভোরে খবর ছড়িয়ে পড়ল—  

“জামাল করিমের ঘরে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে!”  


এলাকার মানুষ কোনো তদন্ত না করেই গুজবটাকে সত্য ধরে নিল। তারা বলল,  

“যে মাদক বিক্রি করে, সে চুরি করতে পারে না এমন কী কথা!”  


জামালকে রাস্তায় টেনে এনে অপদস্থ করা হলো। তার চেহারা রক্তাক্ত, চোখে আতঙ্ক। তবু সে চিৎকার করে বলল,  

“আমি চুরি করিনি! এটা ফাঁদ!”  


কিন্তু কেউ শুনল না। মানুষ সেই শাস্তি দিল, যেটা তারা নিজেরাই ঠিক করেছিল।  


জামাল পালিয়ে গেল গ্রাম ছেড়ে, শরীর নিয়ে বেঁচে থাকলেও তার সম্মান শেষ হয়ে গেল সেই রাতেই।  


---


### **শেষ প্রতিশোধ**


কয়েক মাস পরে করিমের জীবনেও শুরু হলো পতন। যাদের সে টাকা দিয়ে চালাত, তারা একে একে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার নিজের লোকেরা ভাবতে লাগল—“আজ সে জামালকে ফাঁসিয়েছে, কাল আমাকেও করতে পারে।”  


অবিশ্বাস, ভয় আর নোংরা গুজবে সে একা হয়ে গেল। সালমাও তার থেকে দূরে সরে গেল, কারণ সে জানত, করিমের রাগ যখন ফিরে আসে, তখন তার টার্গেট কেউ নয়—যাকে পায় তাকেই ধ্বংস করে।  


এক রাতে করিমের বাড়িতে আগুন লাগল। লোকজন বলল, এটা নাকি শত্রুর কাজ। কিন্তু কেউ জানল না, আগুনটা হয়তো তার নিজের ভেতরের প্রতিশোধের আগুন থেকেই শুরু হয়েছিল।  


সেদিনের আগুনে করিম বেঁচে গেলেও, তার ঘর-সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আর সেই রাতের পর থেকেই সে হারিয়ে গেল—কেউ জানে না সে বেঁচে আছে না মারা গেছে।


---


### **শেষ পরিণতি**


বছর তিন পর একদিন জামাল ফিরে এল দক্ষিণবিলে। চুপচাপ হাটের পাশে বসে চা খেতে খেতে সে দেখল গ্রামের ছেলেরা এখনো তাকে চোর বলেই ডাকে।  


সে হাসল—একটা বিষণ্ণ হাসি। বলল,  

“মানুষের মুখ বন্ধ করা যায় না, কিন্তু নিজের বিবেক যদি জেগে থাকে, তবু মানুষ মরে না।”  


তারপর ধীরে ধীরে চলে গেল নদীর দিকে। কেউ বলে, সেদিন সে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। আবার কেউ বলে, সে অন্য জায়গায় নতুন জীবন শুরু করেছিল।  


কিন্তু দক্ষিণবিলের মানুষ আজও জানে—দুই চোরের গল্পটা কেবল চুরি নিয়ে নয়, এটা **বিশ্বাসঘাতকতা, লোভ আর প্রতিশোধের এক বিষময় কাহিনি**।


---


### **শিক্ষণীয় কথা:**


> 🔹 **প্রতিশোধ কখনো মানুষকে জিতিয়ে দেয় না, বরং ধ্বংসের পথ খুলে দেয়।**  

> 🔹 **যে বন্ধুত্বে স্বার্থ ঢুকে পড়ে, সে বন্ধুত্ব একদিন নিজের কবর খুঁড়ে ফেলে।**  

> 🔹 **গুজব ও অপবাদ যত সহজে ছড়ায়, তত সহজে সত্যকে ঢেকে ফেলে—কিন্তু শেষপর্যন্ত সত্যই টিকে থাকে।**  

> 🔹 **মানুষের আসল মূল্য তার অর্থ বা প্রভাব নয়, বরং তার সততা।** 


✍️ **লেখক:** এস এফ সেলিম আহম্মেদ  

#গল্প #সমাজবাস্তবতা #শিক্ষণীয় #SFSelimAhmmed

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

মাতৃ ভাষা | রক্তে লেখা একুশ