উত্তরের আগ্নেয় ঘোষণাপত্র | অবহেলিত জনপদের জাগরণের কবিতা
“উত্তরের আগ্নেয় ঘোষণাপত্র”
কবি: এস এফ সেলিম আহম্মেদ।
উত্তরবঙ্গ—
তোমাকে আমি আর জনপদ বলি না,
তুমি এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি,
যার বুকের ভেতর জমে আছে
শতাব্দীর অগ্নি, অবহেলার লাভা,
আর নিঃশব্দ ক্রোধের বিস্ফোরণ।
তুমি মানচিত্রের প্রান্ত নও—
তুমি সেই কেন্দ্র,
যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রান্ত বানিয়ে রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রের ক্যালকুলেশনে তুমি সংখ্যা,
রাজনীতির ভাষায় তুমি স্লোগান,
কিন্তু ইতিহাসের কাছে—
তুমি এক অসমাপ্ত বিচার।
এই ভূখণ্ড ট্যাক্স দেয়—
শৃঙ্খলার সাথে, নীরবতার সাথে,
একটি বাধ্য নাগরিকের মতো।
কিন্তু বিনিময়ে পায়—
অপেক্ষা,
অবজ্ঞা,
এবং উন্নয়নের নামে
একটি দীর্ঘ প্রতারণা।
এখানে উন্নয়ন আসে
ফাইলের ভেতর বন্দী হয়ে,
স্বাক্ষরের নিচে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে—
বাস্তবের মাটিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে
তার মৃত্যু হয়।
এই মাটি খাদ্য দেয়—
ধানের দানা নয়,
এটা জাতির অস্তিত্বের বীজ।
উত্তরের কৃষক
শুধু ফসল ফলায় না,
সে পুরো দেশের ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
তবুও তার ঘরে
ক্ষুধা থাকে অনাহূত অতিথি হয়ে—
এ এক দার্শনিক ব্যঙ্গ,
যেখানে উৎপাদকই ভিখারী।
তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র—
এই নদীগুলো শুধু জল নয়,
এগুলো প্রবাহিত বৈষম্যের প্রতীক।
পানি আছে—
কিন্তু অধিকার নেই।
নদী আছে—
কিন্তু ন্যায্যতা নেই।
বন্যায় ডুবে যায় স্বপ্ন,
খরায় পুড়ে যায় ভবিষ্যৎ—
প্রকৃতি নয়,
পরিকল্পনার অভাবই এখানে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ।
উত্তরের যুবক—
সে রাজধানীর কারখানায়
তার যৌবন বিক্রি করে।
তার ঘাম
দেশের জিডিপি বাড়ায়,
কিন্তু তার নাম
কোনো সম্মাননায় লেখা হয় না।
সে শ্রমিক নয়,
সে রাষ্ট্রের অব্যবহৃত বিবেক—
যাকে প্রতিদিন শোষণ করা হয়
উন্নয়নের নামে।
শীত এখানে কবিতা নয়—
এটা বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।
একটা কম্বলের নিচে
চারটা শরীর নয়,
চারটা অসমাপ্ত স্বপ্ন কাঁপে।
এই শীত
মানুষকে শুধু ঠান্ডা করে না,
মানুষকে প্রশ্ন করে—
“তোমার রাষ্ট্র কোথায়?”
শিক্ষা এখানে বিলাসিতা,
চিকিৎসা এখানে সংগ্রাম,
অবকাঠামো এখানে প্রতিশ্রুতির কবরস্থান।
একটা হাসপাতাল মানে
মৃত্যুর সাথে দৌড়,
একটা স্কুল মানে
ভবিষ্যতের সাথে আপস।
রাজনীতি এখানে নাটক—
যেখানে উত্তরবঙ্গ
শুধু একটি ডায়লগ,
একটি হাততালি তোলার উপকরণ।
কিন্তু বাস্তবে—
এটা এক নিঃসঙ্গ মঞ্চ,
যেখানে জনগণ
নিজেদের অধিকার
নিজেদেরই খুঁজে বেড়ায়।
উত্তরবঙ্গ—
তোমার প্রতিটি ধূলিকণা জানে,
তোমার সাথে বৈষম্য করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
তোমাকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে
যাতে অন্য কেউ এগিয়ে যেতে পারে।
তোমাকে নীরব রাখা হয়েছে
যাতে অন্যের কণ্ঠস্বর জোরে শোনা যায়।
কিন্তু মনে রেখো—
নীরবতা চিরস্থায়ী নয়।
যেদিন এই নীরবতা ভাঙবে,
সেদিন শব্দ হবে না—
সেদিন হবে বিস্ফোরণ।
উত্তরের মানুষ—
তোমরা করুণার পাত্র নও,
তোমরা সম্ভাবনার শক্তি।
তোমাদের হাতেই আছে
এই রাষ্ট্রের খাদ্য,
এই দেশের শ্রম,
এই জাতির ভবিষ্যৎ।
তোমরা যদি জেগে ওঠো—
সমীকরণ বদলে যাবে।
জেগে ওঠো—
তোমার অধিকারকে ভিক্ষা নয়,
দাবি হিসেবে ঘোষণা করো।
জেগে ওঠো—
তোমার মাটিকে প্রান্ত নয়,
কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করো।
জেগে ওঠো—
কারণ ইতিহাস অপেক্ষা করে না,
ইতিহাস তৈরি করতে হয়।
উত্তরবঙ্গ—
তুমি আর নীরব থাকবে না,
তুমি আর অবহেলিত থাকবে না।
তুমি হবে আগ্নেয়,
তুমি হবে ঘোষণা,
তুমি হবে পরিবর্তনের সূচনা।
আর যেদিন তুমি জ্বলে উঠবে—
সেদিন কেঁপে উঠবে
বৈষম্যের প্রতিটি সিংহাসন।
সেদিন
এই কবিতা নয়—
তুমিই হবে বিপ্লব।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন