ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা
"ছায়া"
— এস এফ সেলিম আহম্মেদ
কখনো কখনো মনে হয়
আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যাই না,
শুধু একটু দূরে সরে দাঁড়াই—
যেমন বিকেলের আলো
নীরবে গাছের পাতা থেকে সরে যায়।
তোমার সাথে আমার যে দিনগুলো ছিল,
সেগুলো এখন আর স্মৃতি নয়,
একটা দীর্ঘ করিডোর—
যেখানে হাঁটলে
পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠি।
তোমার হাসির ভেতরে
আমি একসময় ঘর বানিয়েছিলাম,
জানালায় ঝুলিয়েছিলাম স্বপ্ন,
আর দরজার পাশে রেখে দিয়েছিলাম
ফিরে আসার অজুহাত।
কিন্তু প্রেম কখনো ভাঙে না—
সে শুধু রূপ বদলায়।
আজ তুমি নেই,
তবুও ভিড়ের মাঝখানে
হঠাৎ মনে হয় কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে।
আমি ফিরে তাকাই—
শুধু একটা ছায়া,
আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যায়।
জানো,
মানুষ চলে গেলে তার উপস্থিতি ফুরায় না,
বরং আরও স্পষ্ট হয়—
নীরবতার মতো স্পষ্ট,
অপূর্ণ চিঠির মতো স্পষ্ট।
তোমাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করিনি কখনো,
কারণ ভুলে যাওয়া মানে
নিজের এক অংশকে হত্যা করা।
এখন আমি রাত জেগে থাকি না,
তবুও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে
মনে হয়—
আমার ভেতরে কেউ হাঁটছে ধীরে ধীরে।
সম্ভবত সেটা তুমি নও,
তবুও তোমার মতো লাগে।
আমাদের প্রেমের শেষটা
কোনো ঝড় ছিল না,
ছিল নিঃশব্দ তুষারপাত—
যেখানে শব্দ না থাকলেও
সবকিছু ঢেকে যায়।
আজ আমি আলোতে দাঁড়াই,
তবুও বুঝি—
আমার পায়ের নিচে যে অন্ধকার,
সেটা তোমার রেখে যাওয়া ছায়া।
আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
আমি আর সেই ছায়া থেকে বের হতে চাই না।
কারণ সেখানে এখনো
তোমার স্পর্শের উষ্ণতা আছে।
কিছু ভালোবাসা
মানুষ হয়ে থাকে না,
ছায়া হয়ে থাকে—
চিরদিন পাশে,
কিন্তু কখনো ধরা দেয় না।
কখনো পুরোনো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে
হঠাৎ বাতাস বদলে যায়,
মনে হয় সময় পিছিয়ে যাচ্ছে—
আর আমি আবার দাঁড়িয়ে আছি
সেই প্রথম বিকেলের সামনে।
তোমার চোখের ভেতর যে আকাশ দেখেছিলাম,
আজও মাঝে মাঝে সেখানে মেঘ জমে—
অকারণ মন খারাপ হয়ে যায়,
যেন বৃষ্টি নামবে,
কিন্তু নামে না।
আমার ডেস্কের ড্রয়ারে এখনো
একটা অপ্রেরিত চিঠি ঘুমিয়ে আছে,
শব্দগুলো হলুদ হয়ে গেছে,
তবুও তারা জানে—
তোমার নাম উচ্চারণ করলেই জেগে উঠবে।
সময় আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে,
শিখিয়েছে হাসতে,
শিখিয়েছে একা হাঁটতে,
কিন্তু শেখাতে পারেনি
কিভাবে তোমাকে ছাড়া সম্পূর্ণ হতে হয়।
কখনো আয়নায় তাকিয়ে দেখি—
আমার চোখে তোমার অনুপস্থিতির ছাপ,
এটা দুঃখ নয়,
এটা এক ধরনের নীরব সহবাস।
মানুষ ভাবে দূরত্ব মানেই শেষ,
আমি জানি—
দূরত্ব কখনো কখনো
ভালোবাসাকে আরও গভীর করে,
আরও অদৃশ্য করে।
তুমি কি জানো?
অসংখ্য নতুন মুখের ভিড়েও
আমি তুলনা করি না কাউকে,
কারণ তুলনা মানেই
তোমাকে ছোট করা।
রাতের শহর যখন নিভে যায়,
আমি তখন শব্দ শুনি—
এটা ট্রাফিক নয়,
এটা হৃদয়ের ভেতর
ধীরে ধীরে ভাঙার আওয়াজ।
হয়তো আমরা ঠিক মানুষ ছিলাম না
একে অপরের জন্য,
তবুও ভুল সময়ে দেখা হওয়াটাও
কখনো কখনো
সবচেয়ে সুন্দর নিয়তি।
আজ যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায়,
আমি কিছুই বলবো না—
শুধু একটু তাকিয়ে থাকবো,
কারণ কিছু অনুভূতি
ভাষা সহ্য করতে পারে না।
জীবন এগিয়ে যাচ্ছে,
নতুন সকাল আসে,
নতুন গল্প জন্মায়—
তবুও আমার ভেতরে
একটা ঋতু থেমে আছে।
সেখানে তুমি হাঁটো,
আমি দূর থেকে দেখি,
কোনো দাবি নেই,
কোনো অভিমান নেই—
শুধু এক অদ্ভুত শান্তি।
শেষ পর্যন্ত বুঝেছি,
সব প্রেম একসাথে থাকার জন্য জন্মায় না—
কিছু প্রেম জন্মায়
মানুষকে গভীর করার জন্য।
তাই আজও যখন সূর্য ডুবে যায়,
আমার ছায়া লম্বা হয়,
আর আমি হেঁটে যাই—
নিজের পাশেই আরেকটি উপস্থিতি নিয়ে।
হয়তো সেটাই তুমি,
হয়তো সেটাই প্রেমের অন্য নাম—
অদৃশ্য, অথচ অনিবার্য।
আর যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,
তুমি কোথায় আছো—
আমি আলো দেখিয়ে বলবো না,
অন্ধকার দেখিয়ে বলবো,
"ওখানেই… আমার ছায়ার ভেতর।"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন