দূরত্বের মাঝি - পর্ব ৪ | পুনর্মিলন ও ঝড়ের পরীক্ষা

দূরত্বের মাঝি - পর্ব ৪

লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ।


পর্ব ৩–এর সেই সন্ধ্যার পর, শর্মিলা এবং এস এফ একই ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। নীরবতা দীর্ঘ। বাইরে নদীর গর্জন। ঘরের ভিতরের বাতাসে অনিশ্চয়তার গন্ধ।


শর্মিলা চুপচাপ বলল, “তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আমি ভয় পেয়েছিলাম।”


এস এফ চোখে পানি নিয়ে হেসে বলল, “আমি এসেছি। আর এবার আর দূরত্বের ছায়া থাকবে না।”


শর্মিলার চোখে অশ্রু, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বাইরে বাতাসে হঠাৎ ঝড়ের আভাস। নদী উত্তাল হয়ে উঠছে।


মাঝে মাঝে চিঠি পড়ার স্মৃতি ভেসে আসে—কতক্ষণ ধরে তারা একে অপরের কথা শোনেনি। ভেতরের ঝড়, আবেগের ঝড়, সব মিলেমিশে এক গভীর ধ্বনি তৈরি করেছে।


এস এফ শর্মিলার হাতে হাত রাখল। “শর্মিলা, জানি সব সময় সহজ হয়নি। দূরত্ব, ঝড়—সবই আমাদের পরীক্ষা করেছে।”


শর্মিলা চোখ নেমে গেল। “তুমি আসছ, এটাই যথেষ্ট। কিন্তু নদী...” তার কণ্ঠে কিছু অশ্রু ও ভয়।


নিশ্চয়, নদী চরাঞ্চলে ভয়ঙ্কর। উত্তাল ঢেউ, ভাঙা চর, কাদার রাস্তা। কিন্তু আজ শর্মিলা জানে—এস এফ তাকে ছেড়ে যাবে না।


বাইরে বাতাস তীব্র। ঘরের জানালার টিন কাঁপছে। ঝড়ের শব্দ ভেতরে ঢুকে তাদের দুজনকে ঘিরে ধরেছে। শর্মিলা চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাতাসের শব্দ শুনছ?”


এস এফ হেসে বলল, “হ্যাঁ। আমাদের মতোই, নদীও পরীক্ষা নিচ্ছে।”


চিঠির কথা স্মৃতিতে ফিরল—প্রতি অক্ষরে অনুভূত শিহরণ, প্রতিটি শব্দের মধ্যে থাকা অপেক্ষা। সে বুঝল, প্রতিটি দুঃখের মুহূর্তই তাদের সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে।


রাত গভীর হলে, বাইরে নদীর প্রবাহ আরও উত্তাল। চরাঞ্চলের মানুষ আতঙ্কিত। এস এফ জানে, তিনি শুধু শর্মিলার পাশে না—সবাইকে সাহায্য করতে হবে। শর্মিলাও তাকে থামাচ্ছে না, বরং পাশে থেকে সাহস দিচ্ছে।


তারা দুজন বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াল নদীর ধারে। পানি ইতিমধ্যে ঘরের উঠোনে ঢুকেছে। শর্মিলা হাত ধরে বলল, “যদি নদী সব ভেঙে দেয়?”


এস এফ দৃঢ়ভাবে বলল, “তবে আমরা একসাথে থাকব। নদী আমাদের ছিন্ন করবে না। শুধু আমাদের পরীক্ষা নেবে।”


ঝড়ের মধ্যেও তারা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে কাদা উড়ছে, ঢেউ ভাঙছে, পাখি আকাশে উড়ছে। নদী প্রবাহিত, উত্তাল, ভয়ঙ্কর—তবুও তাদের বন্ধন দৃঢ়।


শর্মিলা তার চোখ বন্ধ করে চুপচাপ অনুভব করছে—ভয়ের সঙ্গে স্বস্তি, দুঃখের সঙ্গে আশা। এস এফ তার কাঁধে হাত রাখে। দুজনের মনে হয়েছে, নদীর ঝড়ের মতোই তাদের সম্পর্কও উত্তাল, কিন্তু এখন একে অপরকে সমর্থন দিচ্ছে।


বৃষ্টি থেমে যায়, রাতের আলো ঢেউয়ের উপর পড়ে। চরাঞ্চলের ঘরবাড়ি ভাঙা, মানুষ আতঙ্কিত, কিন্তু তারা একসাথে। দূরত্ব এখনো বাস্তব, নদীর ঝড়ও বাস্তব, কিন্তু তাদের সাহস, ভালোবাসা, এবং সিদ্ধান্ত—এগুলোই শক্তিশালী।


পরের সকাল, সূর্য মেঘের ফাঁক দিয়ে আকাশে আসছে। পানি কিছুটা নেমে গেছে, চরাঞ্চল জেগে উঠেছে। শর্মিলা ঘরের উঠোনে দাঁড়িয়ে নদী দেখছে। তার পাশে এস এফ।


শর্মিলা ধীরে বলল, “এখন আমরা কি ঠিক পথে?”


এস এফ মৃদু হেসে বলল, “যদি আমরা একসাথে থাকি, পথ ঠিক থাকতেই হবে। দূরত্ব বড় বাধা নয়।”


তাদের চোখে এখন আর অজানা নেই। নদীর ঢেউ বইছে, কিন্তু তারা জানে—প্রতিটি ঢেউই তাদের ভালোবাসাকে পরীক্ষা করছে, কিন্তু ভাঙতে পারবে না।


বাইরে নদী এখনও উত্তাল। চরাঞ্চল এখনও ঝড়ে। কিন্তু শর্মিলা এবং এস এফ—দূরত্বের মাঝি দুজন—এবার একসাথে।


শেষ লাইন:

“নদী এখনো উত্তাল। কিন্তু এবার মাঝি দুজন।”

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

দূরত্বের মাঝি - পর্ব ১ | শর্মিলা ও এস এফের প্রেমের কাহিনী