স্বকীয়তার ভাষা | বাংলা ভাষার উৎস, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদার কাব্যিক উচ্চারণ
স্বকীয়তার ভাষা
এস এফ সেলিম আহম্মেদ
বাংলা কোনো সাম্রাজ্যের অনুবাদ নয়,
কোনো বিজেতার ছায়ালিপি নয়,
কোনো রাজদরবারের দাক্ষিণ্যে পাওয়া নামও নয়—
সে জন্মেছে ধীরে,
সময়ের অদৃশ্য পরীক্ষাগারে,
উপমহাদেশের মাটির গভীর রসায়নে।
প্রাচীন প্রাকৃতের নিঃশ্বাসে
মাগধী অপভ্রংশের রূপান্তরে
লোকজ উপভাষার অশ্রুত সুরে
একটি উচ্চারণ ধীরে ধীরে রক্ত পেল, শরীর পেল,
নাম পেল—বাংলা।
আরবের মরু তখনও দূরে,
ফার্সির অমরাবতী তখনও অচেনা,
এই ভূখণ্ডের মানুষ
মাঠে, ঘাটে, নদীর বাঁকে,
জোৎস্না-ভেজা উঠোনে
নিজেদের ভাষায়ই বলেছে জীবনের কথা।
ভাষা একদিনে জন্মায় না—
তা জন্ম নেয় ইতিহাসের গর্ভে।
যেমন নদী নিজের পাড় নিজেই গড়ে,
যেমন পলি জমে নতুন ভূমির জন্ম দেয়,
তেমনি ভাষা সময়ের স্তরে স্তরে
নিজস্ব কাঠামো নির্মাণ করে।
সংস্কৃত দিয়েছে শাস্ত্রের শব্দ,
আরবি দিয়েছে বিশ্বাসের বিস্তার,
ফার্সি দিয়েছে অলংকারের অনুরণন—
কিন্তু বাংলা তার শিরদাঁড়া পেয়েছে
এই মাটির মানুষের কণ্ঠে।
বাংলার ধ্বনিতে আছে নদীর ঢেউ,
বাংলার ব্যাকরণে আছে মাঠের সরলতা,
বাংলার বাক্যে আছে লোকজ প্রজ্ঞার বিনয়।
এ ভাষা ধার করা দেহ নয়—
এ এক জীবন্ত সত্তা,
যার রক্তে মিশে আছে জনপদের ইতিহাস।
চর্যার গুপ্ত বাণী থেকে
মঙ্গলকাব্যের উচ্ছ্বাস,
লোকগানের মাটির গন্ধ থেকে
আধুনিকতার যুক্তিবাদী উচ্চারণ—
সবই একই ধারার বিস্তার,
একই শেকড়ের পুষ্টি।
ভাষা গ্রহণ করে,
কিন্তু আত্মসমর্পণ করে না।
ভাষা শিখে,
কিন্তু নিজের মেরুদণ্ড ভাঙে না।
যারা বলে—বাংলা প্রভাবের সন্তান,
তাদের বলি—
প্রভাব মানে উৎস নয়।
উৎস মানে জন্মের স্বাক্ষর,
আর সেই স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ আছে
এই মাটির ধুলোয়,
এই মানুষের উচ্চারণে।
বাংলা কেবল শব্দ নয়,
এ এক সাংস্কৃতিক মানচিত্র—
এতে আছে স্মৃতি,
এতে আছে সংগ্রাম,
এতে আছে মুক্ত চিন্তার অবিনাশী রেখা।
এই ভাষায় প্রথম “মা” উচ্চারিত হয়,
এই ভাষায় প্রতিবাদ আগুন হয়ে ওঠে,
এই ভাষায় প্রেম শাশ্বততার রূপ পায়।
বাংলা নিজেকে ধার দেয় না—
সে নিজেই ধারার উৎস।
বাংলা কারও প্রতিচ্ছবি নয়—
সে নিজেই আয়না,
যেখানে একটি জাতি নিজের মুখ দেখে।
যতদিন নদী তার গতিপথ বদলাবে,
যতদিন ইতিহাস প্রশ্ন তুলবে,
যতদিন মানুষ নিজের পরিচয় খুঁজবে—
ততদিন বাংলা
নিজের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে
নিজেকেই নতুন করে নির্মাণ করবে।
এ ভাষা কোনো প্রভাবের অবশেষ নয়—
এ ভাষা এক স্বকীয় সভ্যতার উচ্চারণ।
এ ভাষা স্বাধীনতার নীরব প্রতিজ্ঞা।
এ ভাষা—আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম নাম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন