দূরত্বের মাঝি - পর্ব ৩ | অপেক্ষার ভোর ও না-বলা কথার ভার
দূরত্বের মাঝি - পর্ব ৩
লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ।
ব্রহ্মপুত্রের স্রোত কখনোই একরকম থাকে না। গত কয়েকদিন ধরে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। আকাশে ঘন মেঘ, বাতাসে ভেজা কাদার গন্ধ, আর চরাঞ্চলের মানুষজনের চোখেমুখে অদৃশ্য উৎকণ্ঠা। শর্মিলা বুঝতে পারছিল—কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই সে শুনলো পাশের বাড়ির রওশন চাচার কণ্ঠ, “পানি বাড়তেছে, গাঙ্গেরপাড় টিকবো তো?”
এই কথাটা তার বুক কাঁপিয়ে দিল। চরাঞ্চলে জন্মানো মানুষরা নদীর মেজাজ বোঝে। ব্রহ্মপুত্র যখন নীরব থাকে, তখনও ভয় থাকে; আর যখন চঞ্চল হয়, তখন আতঙ্ক ছড়ায়।
শর্মিলা ঘরের দরজা খুলে বাইরে তাকালো। নদী আগের চেয়ে অনেক ফুলে উঠেছে। স্রোতের শব্দ ভারী। দূরে কয়েকটা গাছের গোড়া ইতিমধ্যে পানিতে ডুবে গেছে। বাতাসে বালুর ধুলো উড়ছে।
তার প্রথম মনে পড়লো—এস এফ।
মোবাইল হাতে নিয়ে কল দিল। নেটওয়ার্ক নেই। আবার চেষ্টা করলো। ‘কল ফেলড।’ তার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হলো। যেন এই মুহূর্তে তার একমাত্র নিরাপদ জায়গা হলো এস এফের কণ্ঠ, অথচ সেটাই অধরা।
অন্যদিকে, মূল ভূখণ্ডে বসে এস এফ খবরের কাগজে দেখছিল—উজানে ভারী বর্ষণ, নদীর পানি বৃদ্ধি। তার চোখ আটকে গেল ব্রহ্মপুত্রের ছবিতে। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে শঙ্কা জাগলো। সে জানে, শর্মিলাদের চর খুব নিচু। পানি বাড়লে প্রথম আঘাত সেখানেই লাগে।
সে দ্রুত ফোন করলো। একবার, দু’বার, পাঁচবার। প্রতিবারই একই ফল—নেটওয়ার্ক অপ্রাপ্য।
এস এফের মনে হলো, সে যেন অন্ধকার ঘরে আটকে আছে। দূরে কোথাও ঝড় হচ্ছে, আর সে শুধু শব্দ শুনছে—কিছু করতে পারছে না।
চরাঞ্চলে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। গাঙ্গেরপাড় একপাশ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করলো। মানুষজন জিনিসপত্র উঁচু জায়গায় তুলছে। গরু-ছাগল বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ স্থানে।
শর্মিলার মা বললেন, “কাগজপত্র, টাকাপয়সা গুছায়া রাখ।”
শর্মিলা তাড়াহুড়ো করে তার ছোট বাক্স খুললো। সেখানে এস এফের সব চিঠি। মুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল। বাইরে পানি ঢুকছে, আর তার হাতে ধরা প্রেমের অক্ষর। সে চিঠিগুলো বুকের কাছে চেপে ধরলো। যেন এই কাগজগুলোই তার সাহস।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। আকাশ কালো। ঝড়ো হাওয়ায় টিনের চাল কাঁপছে। বৃষ্টি শুরু হলো মুষলধারে। নদীর গর্জন আরও ভয়ঙ্কর।
এই ভয়ংকর মুহূর্তে শর্মিলার মনে পড়লো পর্ব ১-এর সেই সকাল—যেদিন সে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে প্রথম বলেছিল, “আমরা দূরত্বের মাঝি।” আজ যেন সেই কথার পরীক্ষা।
মূল ভূখণ্ডে এস এফ আর স্থির থাকতে পারলো না। সে সিদ্ধান্ত নিল—যা-ই হোক, তাকে যেতে হবে। অন্তত কাছাকাছি। যদি কিছু ঘটে, সে দূরে বসে থাকতে পারবে না।
রাতে অটোরিকশা করে সে রওনা দিল নদীর ঘাটের দিকে। জানালার বাইরে অন্ধকার, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি। তার মনে শুধু একটাই ছবি—ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শর্মিলা।
ঘাটে পৌঁছে সে দেখলো নদী উত্তাল। নৌকা চলছে না। মাঝিরা বললো, “এই পানিতে নামা বিপদ।”
এস এফ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে হলো ব্রহ্মপুত্র তাকে চ্যালেঞ্জ করছে—“তুমি কি সত্যিই মাঝি হতে পারবে?”
সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মনে পড়লো শর্মিলার চিঠির সেই লাইন—‘কখনো ছেড়ে যাবে না।’
চরাঞ্চলে রাতটা ছিল দীর্ঘ। পানি ঘরে ঢোকেনি পুরোপুরি, কিন্তু উঠোন ভেসে গেছে। শর্মিলা মাটির ঘরের কোণে বসে আছে। হাতে চিঠির বাক্স। তার ঠোঁট কাঁপছে, তবুও সে নিজেকে শক্ত রাখছে।
সে ফিসফিস করে বললো, “এস এফ, তুমি আসবা তো?”
সকালে বৃষ্টি কমলো। নদীর পানি এখনো ফুলে আছে, কিন্তু স্রোত কিছুটা শান্ত। খবর এলো—কয়েকটা নৌকা সীমিতভাবে পারাপার শুরু করবে।
এস এফ প্রথম নৌকায় ওঠার চেষ্টা করলো। মাঝি সতর্ক করলো, “ভাই, পানি এখনো ভালো না।”
সে বললো, “ওপারে আমার মানুষ আছে।”
নৌকা ছাড়লো। উত্তাল পানিতে দুলতে দুলতে এগোচ্ছে। এস এফের মনে অদ্ভুত শান্তি—সে অন্তত চেষ্টা করছে।
চরে পৌঁছে সে দেখলো কাদামাখা পথ, ভাঙা বেড়া, ভেজা গাছ। মানুষের চোখে ক্লান্তি। সে শর্মিলাদের বাড়ির দিকে দৌড়ালো।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিল। ভিতর থেকে শর্মিলার কণ্ঠ—“কে?”
এস এফ বললো, “আমি।”
দরজা খুলতেই দুজনের চোখে একসাথে জল এলো। কোনো বড় সংলাপ নয়। শুধু নীরবতা। বাইরে নদীর শব্দ এখনো আছে, কিন্তু তাদের মাঝের দূরত্ব নেই।
শর্মিলা বললো, “তুমি আসছো?”
এস এফ মৃদু হেসে বললো, “মাঝি হতে গেলে নদীতে নামতেই হয়।”
এই মুহূর্তে তারা বুঝলো—প্রেম শুধু চিঠিতে নয়, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর নাম।
পর্ব ৩ শেষ হয় সেই একই নদীর সামনে দাঁড়িয়ে। ব্রহ্মপুত্র এখনো প্রবাহমান, অনিশ্চিত। কিন্তু শর্মিলা ও এস এফের সম্পর্ক এক ধাপ এগিয়ে গেছে। দূরত্ব এখনো বাস্তব, কিন্তু সাহসও এখন বাস্তব।
দূরে সূর্যের আলো মেঘ ভেদ করে পড়ছে নদীর বুকে। যেন নতুন শুরু।
**শেষ পর্ব ৩**
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন