দূরত্বের মাঝি - পর্ব ২ | ঝড়, চিঠি ও প্রতিশ্রুতির গভীরতা

দূরত্বের মাঝি - পর্ব ২

লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ।


ব্রহ্মপুত্রের ভোরের রং অন্যরকম। সূর্য ওঠার আগে নদীর বুক জুড়ে ধূসর কুয়াশা নেমে আসে। চরাঞ্চলের ভেজা মাটিতে শিশির জমে থাকে, আর দূরে কোথাও মাঝির বৈঠার শব্দ ভেসে আসে টুপটাপ ছন্দে। শর্মিলা সেদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙতেই বুঝেছিল—তার মনটা ভারী। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে কাঁচা কাদার গন্ধ, আর বুকের ভেতর এক অদৃশ্য শূন্যতা।


গতরাতে এস এফের সাথে ঠিকমতো কথা বলা যায়নি। মোবাইলের নেটওয়ার্ক হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল। মাঝখানে তার কণ্ঠ থেমে গিয়েছিল—“শর্মিলা, শোনো…” তারপর আর কিছুই শোনা যায়নি। সেই অসমাপ্ত বাক্যটাই যেন সারারাত তার কানে বাজছিল।


চরের জীবন এমনই। নদী যেমন হঠাৎ দিক বদলায়, তেমনি এখানে যোগাযোগও অনিশ্চিত। কখনো সিগন্যাল আসে, কখনো আসে না। কখনো বিদ্যুৎ থাকে, কখনো অন্ধকারে ডুবে যায় সব। কিন্তু শর্মিলার হৃদয়ে যে আলো জ্বলছে, সেটি নিভে না। তবুও দূরত্বের চাপ তাকে মাঝে মাঝে নীরব করে দেয়।


সকালবেলা সে নদীর ধারে গিয়ে বসলো। ব্রহ্মপুত্রের স্রোত আজ একটু চঞ্চল। ভাঙনের দাগ দেখা যাচ্ছে ওপারের চরে। জেলেরা জাল ফেলছে, দূরে গরু চরছে, বাচ্চারা খালি পায়ে কাদায় দৌড়াচ্ছে। এই সবকিছুর মাঝেও শর্মিলা যেন আলাদা এক জগতে। তার হাতে এস এফের আগের চিঠি। বহুবার পড়া, তবু নতুন লাগে।


চিঠির একটি লাইন তার বুক কাঁপিয়ে দেয়—

“দূরত্ব যদি নদী হয়, তবে বিশ্বাস আমাদের নৌকা।”


সে ফিসফিস করে বলে, “তাহলে মাঝি কে?”

নিজেই উত্তর দেয়, “আমরাই।”


কিন্তু আজ তার মন মানছে না। সে চায় এস এফ তার পাশে থাকুক। ঝড় এলে হাত ধরে দাঁড়াক। নদী ফুলে উঠলে সাহস দিক। শুধু কাগজের অক্ষরে নয়, বাস্তবে। এই চাওয়াটা কি ভুল?


অন্যদিকে, মূল ভূখণ্ডে বসে এস এফও অস্থির। রাতের অসমাপ্ত কথাটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে জানে, শর্মিলার মন নরম। বাইরে থেকে শক্ত দেখালেও ভেতরে সে ভীষণ সংবেদনশীল। চরের অনিশ্চিত জীবন তাকে সাহসী করেছে, কিন্তু একা করে দিয়েছে।


এস এফ টেবিলে বসে নতুন চিঠি লিখতে শুরু করলো। কলমের কালিতে যেন তার হৃদয়ের ভার মিশে আছে।


“প্রিয় শর্মিলা,

গতরাতে কথাটা শেষ করতে পারিনি। সিগন্যাল আমাদের কথা থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু আমার অনুভূতি থামেনি। তুমি যখন বললে—‘সবকিছু খুব কঠিন’, আমি বুঝেছি তোমার ভেতরে কতটা চাপ। বিশ্বাস করো, আমি দূরে থেকেও তোমার পাশে আছি। নদী যদি আমাদের মাঝখানে দাঁড়ায়, তবে আমি সেই নদীর স্রোত পড়ে নিতে শিখবো।”


চিঠি লিখতে লিখতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। জানালার বাইরে শহরের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, মানুষজনের ব্যস্ততা। অথচ তার মন পড়ে আছে কাদা মাখা এক চরাঞ্চলে, যেখানে শর্মিলা হয়তো এখন নদীর দিকে তাকিয়ে।


দুপুরের দিকে আকাশ কালো হলো। হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়া উঠলো। চরাঞ্চলে ঝড় মানেই আতঙ্ক। ঘরের টিনের চাল কাঁপে, গাছ নুয়ে পড়ে, নদীর পানি ফুলে ওঠে। শর্মিলা তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে জানালা বন্ধ করলো। তার মনে পড়ে গেল এস এফের কথা—“ঝড় যত বড় হোক, তুমি ভয় পেও না।”


ঝড়ের শব্দের মাঝেই তার মোবাইল একবার কেঁপে উঠলো। দুর্বল সিগন্যাল। এস এফের একটি ছোট মেসেজ—

“তুমি ঠিক আছ তো?”


শর্মিলার চোখ ভিজে গেল। এত দূর থেকেও সে বুঝতে পারে। এই বুঝতে পারাটাই কি ভালোবাসা নয়?


ঝড় থামার পর আকাশে এক টুকরো রোদ উঠলো। নদীর পানি চকচক করছে। শর্মিলা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—সে আর মন খারাপ লুকাবে না। সে লিখবে। নিজের কষ্ট, নিজের চাওয়া, নিজের ভয়—সব খুলে বলবে।


সন্ধ্যায় সে কাগজ কলম নিয়ে বসলো। তার হাত কাঁপছিল। তবু লিখলো—


“এস এফ,

আমি শক্ত, কিন্তু সবসময় না। মাঝে মাঝে খুব একা লাগে। নদীর শব্দ রাতে ভয় ধরায়। ঝড় এলে মনে হয় সব ভেসে যাবে। তখন তোমাকে খুব কাছে চাই। শুধু চিঠিতে নয়, সত্যিকারের উপস্থিতিতে। তবু জানি, তোমারও সীমাবদ্ধতা আছে। তাই অভিমান করি, আবার নিজেই সামলাই। তুমি শুধু একটা কথা দিও—কখনো ছেড়ে যাবে না।”


চিঠি ভাঁজ করতে করতে তার বুক হালকা হলো। মনে হলো কথাগুলো লিখেই সে একটু শান্ত।


কয়েকদিন পর চিঠি পৌঁছালো এস এফের হাতে। পড়তে পড়তে সে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে বুঝলো—এবার শুধু সান্ত্বনার কথা লিখলে হবে না। তাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, ভবিষ্যতের রূপরেখা আঁকতে হবে।


সে আবার লিখলো—


“শর্মিলা,

আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না। নদী পার হওয়ার সাহস আমার আছে। হয়তো আজ নয়, কিন্তু একদিন এই দূরত্ব কমাবো। তুমি শুধু বিশ্বাস রেখো। তুমি একা নও। তোমার প্রতিটি ভয়, প্রতিটি স্বপ্ন আমারও।”


চরের আকাশে আবার পূর্ণিমা এলো। সাদা আলোয় নদী যেন রূপালি ফিতা। শর্মিলা চিঠি পড়ে আকাশের দিকে তাকালো। মনে হলো, দূরত্ব সত্যিই বড়, কিন্তু তার চেয়েও বড় তাদের বোঝাপড়া।


সে ফিসফিস করে বললো, “আমরা পারবো।”


পর্ব ২ শেষ হয় এক নতুন উপলব্ধিতে। দূরত্ব এখনো আছে, নদী এখনো মাঝখানে। কিন্তু চিঠির অক্ষরগুলো আরও দৃঢ়, প্রতিশ্রুতিগুলো আরও গভীর। শর্মিলা আর এস এফ বুঝতে শুরু করেছে—মাঝি হতে গেলে শুধু বৈঠা নয়, সাহসও লাগে। আর সেই সাহস তারা ধীরে ধীরে অর্জন করছে।


**শেষ পর্ব ২**

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

মাতৃ ভাষা | রক্তে লেখা একুশ