ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৬ – শেষ পর্ব)
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৬ – শেষ পর্ব)
— এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক
সকাল হয়েছে।
ভোটের দিন শেষ, কিন্তু ভোট শেষ হয়নি।
শহরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত। যেন গত রাতের রক্ত, আগুন আর কান্না সবই ছিল কোনো খারাপ স্বপ্ন।
ভোটকেন্দ্রের সামনে লাইন ছোট। কিন্তু দেয়ালে দেয়ালে ভয় এখনও লম্বা।
ময়নুল খুব ভোরে ঘর ছেড়েছে। সিফাতের রক্ত শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তার কাগজ এখনো ভেজা— ঘামে, আতঙ্কে, দায়িত্বে।
ভোটকেন্দ্রে ঢোকার আগে ময়নুল একবার পেছনে তাকায়।
এই শহর তাকে অনেক কিছু দিয়েছে— ভাষা, পেশা, মানুষ।
আজ এই শহরের কাছেই তার শেষ ঋণ শোধ করার দিন।
ভোট চলছে।
কাগজে কাগজে সিল পড়ছে, কিন্তু মানুষ কম।
এক বুথের কোণে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাত কাঁপছে।
সে ফিসফিস করে বলে, “কাল রাতে আমার ছেলে পালিয়েছে। আমি ভোট দিতে এসেছি… সে যেন বৃথা না যায়।”
ময়নুল কিছু বলে না।
এই দেশে এখন কথা কম, নীরবতার দাম বেশি।
দুপুরের দিকে ফলাফলের গুঞ্জন শুরু হয়।
যারা ভয় ছড়িয়েছিল, তারা আত্মবিশ্বাসী।
কারণ তারা জানে— ভয় কখনো ভোট হারায় না।
ঠিক তখনই ময়নুল সিদ্ধান্ত নেয়।
সে সিফাতের কাগজ বের করে।
নাম, স্বাক্ষর, নির্দেশ— সব স্পষ্ট।
এই কাগজ প্রকাশ মানেই—
সে আজ বাড়ি ফিরবে না।
সে জানে।
তবুও সে এগোয়।
শহরের একমাত্র স্বাধীন প্রেস ক্লাব।
দরজা বন্ধ।
কিন্তু ভেতরে আলো জ্বলে।
ময়নুল কাগজগুলো টেবিলে রাখে।
একজন প্রবীণ সাংবাদিক ধীরে ধীরে পড়ে।
তার চোখ কাঁপে।
সে বলে, “এগুলো ছাপা মানে যুদ্ধ।”
ময়নুল উত্তর দেয়, “না। এগুলো ছাপা মানে ইতিহাস।”
বিকেলের দিকে ফল ঘোষণা হয়।
জয় আসে।
মাইকে উল্লাস।
বাজি ফোটে।
কিন্তু একই সময়ে প্রেস ক্লাব থেকে বের হয় বিশেষ সংখ্যা।
শিরোনাম বড়—
“ভয়ের তালিকা: রাষ্ট্র কীভাবে ভোট নিয়ন্ত্রণ করল”
নাম আছে।
প্রমাণ আছে।
সিফাতের লেখা।
ময়নুলের দায়িত্ব।
শহর থমকে যায়।
রাত নামতেই ময়নুলকে নিতে আসে।
কোনো মারধর নয়।
শুধু বলা হয়, “আপনি অনেক দূর গিয়েছেন।”
ময়নুল হাসে।
কারণ সে জানে—
কথা আর ফেরানো যাবে না।
শেষ দৃশ্য।
একটি স্কুলঘর।
কয়েকজন ছাত্র দেয়ালে লিখছে—
“ভয় দিয়ে ভোট নেওয়া যায়, ইতিহাস নয়।”
শহর আবার শ্বাস নেয়।
ধীরে।
ভাঙা গলায়।
কিন্তু বেঁচে।
এখানেই শেষ—
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান থামে না, কিন্তু তার বিরুদ্ধে একটি ভাষা জন্ম নেয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন