ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৩)
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৩)
— এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক
শহর ঘুমায়নি। শহর শুধু চোখ বন্ধ করে ছিল।
ভোটের মাঠে যে যুবকটি মারা গেছে, তার নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। নাম ঘোষণা মানে দায়িত্ব—আর দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না।
ময়নুল সকালবেলা খবরের কাগজ হাতে নিতেই বুঝে যায়—খুনটা পাতায় নেই। এক কোণে ছোট করে লেখা: “নির্বাচনী সহিংসতায় এক ব্যক্তি আহত।”
আহত! মৃত মানুষও এখানে আহত হয়ে যায়।
সে ছেলেটার মা থানায় গিয়েছিল। ফিরে এসে শুধু বলেছে— “আমাকে বলা হয়েছে, বেশি কথা বললে ছেলের লাশও পাব না।”
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান এখন আর শুধু নেতাদের মুখে নয়— এটা পুলিশের নোটবুকে, প্রশাসনের ফাইলে, আর নীরবতার শব্দে।
সিফাত নিখোঁজ।
কাল রাত থেকে তার ফোন বন্ধ। ভাঙা ক্যামেরাটা বাসায় পড়ে আছে, কিন্তু মানুষটা নেই।
ময়নুল বুঝে যায়— এই শহরে এখন সত্যের ওজন বেশি হয়ে গেছে।
ভোটের প্রস্তুতির মিটিং বসে। উপজেলা অফিসে নেতারা বসে হাসে, চা খায়।
রুবেল বলে, “দুই-একটা ঘটনা হলে কিছু যায় আসে না। নির্বাচন তো যুদ্ধই।”
যুদ্ধ! কিন্তু এখানে সেনা নেই—শুধু নাগরিক।
ফারুক হেসে যোগ করে, “ভয় না থাকলে ভোট থাকে না।”
এই বাক্য কেউ লিখে রাখে না, কিন্তু শহরটা ঠিকই মুখস্থ করে ফেলে।
পুলিশ সুপারের কক্ষে বৈঠক হয়। নির্দেশ আসে— “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে—এই ভাষা ব্যবহার করবেন।”
নিয়ন্ত্রণ মানে এখানে সত্যকে নিয়ন্ত্রণ।
ময়নুল স্কুলে গেলে দেখে— ভোটার তালিকার সামনে মানুষের ভিড় নেই।
ভোট দিতে যাওয়া এখন সাহসের পরীক্ষা।
এক বৃদ্ধ এসে ফিসফিস করে বলে, “স্যার, নাম কেটে দিলে কি কেউ জানবে?”
ময়নুল উত্তর দিতে পারে না।
কারণ এই দেশে নাম থাকা আর না থাকার ফারাক মাঝে মাঝে জীবন-মৃত্যুর সমান।
রাত নামতেই শহরের আরেক প্রান্তে আগুন লাগে। এবার লক্ষ্য—একটা পত্রিকার অফিস।
কাগজ পুড়ে যায়। খবর পুড়ে যায়।
কিন্তু ধোঁয়া পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
ময়নুল তখন জানতে পারে— সিফাতকে শেষ দেখা গেছে ওই অফিসের কাছেই।
নির্বাচনের মাঠ এখন আর কেবল রাস্তায় নয়— এটা ঢুকে পড়েছে ঘরে ঘরে।
মায়েরা ছেলেদের বাইরে যেতে দেয় না। স্ত্রীরা স্বামীদের ভোটের কথা তুলতে মানা করে।
ভোট মানেই ঝামেলা।
কিন্তু ময়নুল জানে— এই ভয়ই ক্ষমতার আসল জয়।
শেষ দৃশ্য।
এক গভীর রাতে ময়নুলের দরজায় কড়া নাড়ে।
দরজা খুলতেই দেখে— সিফাত।
চোখে আতঙ্ক, কণ্ঠে ফিসফিস।
সে বলে, “ওরা তালিকা বানিয়েছে… শুধু ভোটার নয়…”
“তালিকায় কারা থাকবে?”
সিফাত কাঁপা গলায় উত্তর দেয়— “কারা বাঁচবে… আর কারা থাকবে না।”
এইখানেই থামে পর্ব তিন।
পর্ব চার শুরু হবে— ভয়ের তালিকা দিয়ে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন