ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতা ও ছাত্রদল: আত্মসমালোচনা ছাড়া পুনরুত্থান অসম্ভব
ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতা ও ছাত্রদল: আত্মসমালোচনা ছাড়া পুনরুত্থান অসম্ভব
লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ
কবি, লেখক ও কলামিস্ট
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্ররাজনীতি বরাবরই শক্তিশালী একটি চালিকাশক্তি। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে ছাত্রসমাজ ছিল অগ্রভাগে। কিন্তু ইতিহাসের সেই গৌরবময় অধ্যায়ের সঙ্গে আজকের ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতার তুলনা করলে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আজ ছাত্ররাজনীতি সংকটে, ছাত্রসংগঠনগুলো আস্থাহীনতায় ভুগছে, আর ছাত্রসমাজ ক্রমেই রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
এই সংকট সবচেয়ে প্রকটভাবে ধরা পড়ছে বিরোধী রাজনীতির ছাত্রসংগঠনগুলোতে—বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে। বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়েই বিচার করা প্রয়োজন।
### পরিচয়ের সংকট: ছাত্রদল নামেই কি ছাত্র?
আজ এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে “ছাত্রদল” পরিচয়টি অনেক প্রকৃত শিক্ষার্থীর কাছে গর্বের নয়, বরং অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ নিজেকে ছাত্রদলের কর্মী বলে পরিচয় দিতে লজ্জা পায়—এটি কল্পনা নয়, বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো?
কারণটা কঠিন হলেও স্বীকার করতে হবে—ছাত্রদলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রত্বের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি প্রাধান্য পেয়েছে। ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কল্যাণমূলক রাজনীতির বদলে আধিপত্য, পদ-পদবি ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা সংগঠনকে ধীরে ধীরে শিকড়চ্যুত করেছে।
যে সংগঠনের মূল পরিচয় হওয়ার কথা ছিল ‘ছাত্রদের সংগঠন’, সেটিই যখন ছাত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন সংকট অনিবার্য।
### অতীতের দোহাই দিয়ে বর্তমানের দায় এড়ানো যায় না
প্রায়শই শোনা যায়—গত সতেরো থেকে আঠারো বছর ছাত্রদল মাঠে কাজ করতে পারেনি, দমন-পীড়ন ছিল, ক্যাম্পাসে ঢোকা যায়নি। এসব কথা আংশিক সত্য। কিন্তু রাজনীতিতে অজুহাত দীর্ঘদিন টেকে না।
রাজনীতি মানেই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা। ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও সংগঠন গড়ে উঠেছে, নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। সুতরাং শুধু অতীতের ওপর দায় চাপিয়ে বর্তমানের ব্যর্থতা ঢাকার সুযোগ নেই।
আজ প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই দীর্ঘ সময়টাকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে? সংগঠন গঠনের বিকল্প পথ কি খোঁজা হয়েছে? ছাত্রদের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো কি বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যতক্ষণ না সৎভাবে দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ ছাত্রদলের পুনরুত্থান কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
### অভিযোগের রাজনীতি: আত্মঘাতী প্রবণতা
ছাত্ররাজনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি ভয়ংকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—সব ব্যর্থতার দায় চাপানো হচ্ছে ‘গুপ্ত রাজনীতি’, ‘কারচুপি’, ‘বট’ কিংবা অদৃশ্য শক্তির ওপর। এতে হয়তো সাময়িকভাবে দায় এড়ানো যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সংগঠনের জন্য আত্মঘাতী।
রাজনীতিতে ষড়যন্ত্র থাকে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজতে গিয়ে নিজের ব্যর্থতাকে আড়াল করা কখনোই পরিণত রাজনীতির লক্ষণ নয়।
বাস্তবতা হলো—যেখানে ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের কাছে যেতে পারেনি, সেখানে অন্যরা গেছে। যেখানে ছাত্রদল সময় দেয়নি, সেখানে অন্যরা সময় দিয়েছে। ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই তাদের পক্ষেই গেছে।
### ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক: নির্দেশ নয়, সংযোগ দরকার
ছাত্ররাজনীতি কেবল মিছিল-মিটিং বা ব্যানার-ফেস্টুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছাত্ররাজনীতি মানে শিক্ষার্থীদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠা। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে—উপরে বসে নির্দেশ দেওয়ার রাজনীতি দিয়ে নয়।
একজন শিক্ষার্থীর জীবনে পড়াশোনা, পরিবার, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, আর্থিক অনিশ্চয়তা—এসবই বড় বিষয়। ছাত্রসংগঠন যদি এসব বিষয়ে সহমর্মী না হয়, তাহলে সে সংগঠনের প্রতি আস্থা তৈরি হয় না।
ছাত্রদলকে বুঝতে হবে—শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে হয়, তাদের পাশে বসতে হয়, তাদের কথা শুনতে হয়। রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
### শিক্ষামুখী রাজনীতি: সময়ের দাবি
ছাত্রদলের রাজনীতিকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে হলে শিক্ষামুখী ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
প্রথমত, বিনামূল্যে কোচিং কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী আছে, যারা সামান্য সহযোগিতা পেলে অন্যদের পাশে দাঁড়াতে পারে। এতে ছাত্রদের মধ্যে সহযোগিতা ও আস্থার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
দ্বিতীয়ত, মেধাবৃত্তি ও স্কলারশিপ কার্যক্রম চালু করা জরুরি। ছাত্রদলের নামেই হোক বা শুভানুধ্যায়ী সংগঠনের মাধ্যমে—এ ধরনের উদ্যোগ ছাত্রসমাজে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তৃতীয়ত, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার একটি কাঠামোগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, প্রবাসী ও সমাজের বিত্তবানদের যুক্ত করে এই দায়িত্ব নেওয়া অসম্ভব নয়।
### ধর্ম ও সমাজ: অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব নয়
বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তি। মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা ইসলাম নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য ছাত্ররাজনীতিকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
ছাত্রদলের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। এতে কোনো আদর্শিক বিচ্যুতি নেই। বরং সামাজিক সংযোগ বাড়লে সংগঠনের নৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত হয়।
### দক্ষতা ও আত্মনির্ভরশীলতা: রাজনীতির নতুন ভাষা
আজকের শিক্ষার্থীরা শুধু রাজনৈতিক পরিচয় চায় না; তারা চায় দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও আত্মমর্যাদা। ছাত্রদল যদি এই জায়গায় কাজ না করে, তাহলে তারা পিছিয়ে পড়বেই।
বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের—
- সততা ও নৈতিকতা
- যোগাযোগ দক্ষতা
- উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা
গড়ে তুলতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং বা পার্টটাইম কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা আত্মনির্ভরশীল হবে, রাজনীতিও হবে সম্মানজনক।
### বাস্তবতার কঠিন স্বীকারোক্তি
এ কথা স্বীকার করতেই হবে—ছাত্রসমাজের পেছনে সবচেয়ে বেশি সময়, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে জামায়াত-শিবির। তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছে। এখন তারা সেই বিনিয়োগের ফল পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
এটি কারও পছন্দ হোক বা না হোক—এটাই বাস্তবতা।
দেরি হলেও এখনো অসম্ভব নয়। কিন্তু বীজ না বপন করে ফলের আশা করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। যারা দীর্ঘদিন মাঠে থেকেছে, তারাই ফল তুলবে—এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা।
### শক্তির রাজনীতি নয়, শিকড়ের রাজনীতি
রাজনীতিতে একটি ভ্রান্ত ধারণা কাজ করে—ক্ষমতায় গেলে শক্তি দিয়েই সব ঠিক করা যাবে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, এই ধারণা ভুল।
টেকসই রাজনীতি গড়ে ওঠে শিকড়ের ওপর। বীজ বপন করতে হয়, সময় দিতে হয়, পরিচর্যা করতে হয়। সেখান থেকেই বৃক্ষ গড়ে ওঠে, ফল দেয়—এবং সেই বৃক্ষ সহজে উপড়ে ফেলা যায় না।
শর্টকাটে টাকা দিয়ে সংগঠন কেনা যায়, কিন্তু আদর্শ তৈরি করা যায় না। ইতিহাস থেকে এই শিক্ষাই নেওয়া দরকার।
### উপসংহার: এখনও শেষ নয়, যদি এখনই শুরু করা যায়
ছাত্রদল এখনো সম্ভাবনাহীন নয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কঠিন সত্য মেনে নিতে হবে, আত্মসমালোচনা করতে হবে এবং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনায় মাঠে নামতে হবে।
সময় অনেকটাই নষ্ট হয়েছে, পিছিয়ে পড়াও সত্য। কিন্তু এখনই যদি বীজ বপন করা যায়, আগামী দিনের বৃক্ষ এখনও সম্ভব।
ছাত্ররাজনীতি ক্ষমতার শর্টকাট নয়—এটি মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা। সেই যাত্রায় ফিরতে পারলেই ছাত্রদলের ভবিষ্যৎ আবার আলো দেখবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন