অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ : ভণ্ডামি, ক্ষমতা ও সমাজের নীরব ষড়যন্ত্র

 অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ


লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ

কবি, লেখক ও গবেষক


বাংলা প্রবাদ-প্রবচনের ভাণ্ডারে এমন কিছু বাক্য আছে, যেগুলো শুধু কথার কথা নয়—সেগুলো সমাজের গভীর মনস্তত্ত্ব, মানুষের চরিত্র এবং ক্ষমতার আচরণগত সত্যকে অনায়াসে উন্মোচন করে।

“অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ”—এই প্রবাদটি তেমনই একটি নির্মম অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা-জাত উক্তি। চারটি শব্দে মানুষের ভেতরের লোভ, ভয়, ষড়যন্ত্র আর ভণ্ডামির এক দীর্ঘ ইতিহাস যেন ধরা পড়ে।


ভক্তি নিজেই কোনো দোষের বিষয় নয়। বরং ভক্তি মানুষকে শৃঙ্খলিত করে, শ্রদ্ধাশীল করে, মূল্যবোধ শেখায়। কিন্তু যখন এই ভক্তি সীমা ছাড়িয়ে যায়, যুক্তিকে হত্যা করে, প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করে, তখনই তা হয়ে ওঠে অতি ভক্তি। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় সন্দেহ—এই ভক্তি কি সত্যিই ভক্তি, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো স্বার্থ?


ভক্তি ও অতি ভক্তির সূক্ষ্ম সীমারেখা


ভক্তি মানে সম্মান।

অতি ভক্তি মানে আত্মসমর্পণ।


ভক্তি মানে ভালোবাসা।

অতি ভক্তি মানে নিজের বিবেক বন্ধক রাখা।


ভক্ত মানুষ প্রয়োজনে প্রশ্ন করে, সংশোধনের কথা বলে, ভুল দেখিয়ে দেয়।

কিন্তু অতি ভক্ত মানুষ প্রশ্ন করে না—কারণ প্রশ্ন করলে সুবিধা নষ্ট হতে পারে।


সমাজে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যারা সবচেয়ে বেশি মাথা নোয়ায়, সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করে, সবচেয়ে বেশি “স্যার-স্যার” করে—তাদের হাতেই সবচেয়ে বেশি গোপন ফাইল, সবচেয়ে বেশি গোপন দরজা খোলা থাকে।


পরিবারে অতি ভক্তির চেহারা


পরিবারে আমরা অনেক সময় অতি ভক্তিকে ভালো সন্তান বা আদর্শ সদস্য বলে ভুল করি। যে সন্তান কখনো প্রশ্ন করে না, কখনো দ্বিমত পোষণ করে না, সবকিছুতে অতি বিনয় দেখায়—তাকে আমরা প্রশংসা করি।


কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃত সম্পর্ক কখনো নিখুঁত আনুগত্যের উপর দাঁড়ায় না। ভালোবাসায় অভিমান থাকে, মতভেদ থাকে, আবেগ থাকে। যেখানে শুধু ভক্তি আর ভক্তি—সেখানে সম্পর্ক নয়, সেখানে থাকে হিসাব।


অনেক পরিবার ধ্বংস হয়েছে এই অতি ভক্তির কারণে। বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সম্পদ লোপাট, সম্পর্ক ভাঙন, উত্তরাধিকার নিয়ে ষড়যন্ত্র—সবখানেই এই অতি ভক্ত মানুষের ছায়া দেখা যায়।


সমাজে অতি ভক্তি: ভদ্রতার মুখোশ


সমাজে অতি ভক্ত মানুষরা সাধারণত খুব ভদ্র হয়।

তাদের ভাষা নরম, আচরণ মার্জিত, কথাবার্তা মধুর।


কিন্তু এই ভদ্রতার আড়ালে থাকে তীক্ষ্ণ হিসাব।

কে কখন ক্ষমতায় আসবে, কে পড়ে যাবে, কোথায় সুবিধা নেওয়া যাবে—সবই তাদের জানা।


পাড়া-মহল্লার রাজনীতি থেকে শুরু করে সামাজিক সংগঠন, সমিতি, ক্লাব—সবখানেই এই অতি ভক্তরা ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করে। আর সুযোগ পেলেই তারা আসল চেহারা দেখায়।


ধর্মীয় অতি ভক্তি: সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ


ধর্ম মানুষের আত্মশুদ্ধির পথ। কিন্তু ধর্ম যখন অতি ভক্তির মোড়কে বন্দী হয়, তখন তা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র।


যারা নিজেকে সবচেয়ে বড় ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরে, যারা ধর্মের নামে সবচেয়ে বেশি চিৎকার করে, যারা ভিন্নমতকে কাফের বা নাস্তিক আখ্যা দেয়—ইতিহাস বলে, তাদের হাতেই সবচেয়ে বেশি রক্ত লেগে থাকে।


অতি ভক্তি এখানে যুক্তিকে নিষিদ্ধ করে, মানবতাকে ছোট করে, আর মানুষকে মানুষে বিভক্ত করে।


রাজনীতিতে অতি ভক্তি ও গণতন্ত্রের অবক্ষয়


রাজনীতিতে অতি ভক্তি মানেই গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক।

যেখানে নেতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, সেখানে জনগণ অধিকারহীন।


যে কর্মী বলে—“নেতা ভুল করেন না”, সে কর্মী আসলে দলের শত্রু। কারণ ভুল না দেখলে সংশোধন হয় না, সংশোধন না হলে পতন অনিবার্য।


বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের রাজনীতিতে আমরা বারবার দেখেছি—অতি ভক্তরা প্রথমে নেতা বানায় দেবতা, পরে সেই দেবতার পতনের সময় তারাই সবচেয়ে আগে পালায়।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতি ভক্তির নতুন সংস্কৃতি


ডিজিটাল যুগে অতি ভক্তি আরও বিকৃত রূপ নিয়েছে।

ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স—সবখানেই তৈরি হয়েছে অন্ধ সমর্থক বাহিনী।


তারা যুক্তি শোনে না, তথ্য মানে না, ভিন্নমত সহ্য করে না।

শুধু আক্রমণ করে, গালাগালি দেয়, চরিত্র হনন করে।


এই অতি ভক্তির কারণেই সমাজে বিভাজন বেড়েছে, সহনশীলতা কমেছে, চিন্তার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে।


কেন “চোরের লক্ষণ”?


চোর কখনো সামনে থেকে আসে না।

সে বিশ্বাস অর্জন করে, আড়ালে কাজ করে।


অতি ভক্তিও ঠিক তেমনই।

অতিরিক্ত আনুগত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে উদ্দেশ্য—ক্ষমতা, সুবিধা, নিরাপত্তা।


এই কারণেই প্রবাদটি আজও এত প্রাসঙ্গিক—অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ।


শেষ কথা


সমাজ বাঁচাতে হলে আমাদের অতি ভক্তি নয়, সচেতন ভক্তি দরকার।

নেতা নয়, নীতিকে অনুসরণ করতে হবে।

মানুষ নয়, সত্যকে ভালোবাসতে হবে।


যেখানে প্রশ্ন থাকবে, সেখানে আশা থাকবে।

আর যেখানে অতি ভক্তি, সেখানে পতন অনিবার্য।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

মাতৃ ভাষা | রক্তে লেখা একুশ