ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৫)
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ৫)
— এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক
এই রাতটা অন্য সব রাতের মতো নয়।
এই রাতটা ভোটের আগের শেষ রাত— যে রাতে শহর ঠিক করে নেয়, সে আগামীকাল মানুষ থাকবে, নাকি কেবল সংখ্যা হয়ে যাবে।
ময়নুল জানে, সকাল পর্যন্ত কেউ ঘুমোতে পারবে না।
কারণ ভয় আজ আর গুজব নয়— ভয় আজ তালিকাভুক্ত।
ভয়ের তালিকা এখন মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে না, কিন্তু মানুষের চোখে চোখে।
যার চোখে চোখ পড়ে, সে-ই বুঝে যায়— আজ তার নাম আছে কি না।
সিফাত সারাদিন ঘরের ভেতর বসে নোট লিখেছে। সে জানে, এই নোট প্রকাশ পেলে সে বাঁচবে না।
কিন্তু সে-ও জানে— এই নোট না লিখলে আর কেউ বাঁচবে না।
রাত আটটার দিকে প্রথম খবর আসে— দক্ষিণ পাড়ায় এক যুবককে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে।
তার অপরাধ? সে নাকি বলেছিল— “ভোট দেব।”
ভোট দেওয়া এখন মতামত নয়, এটা ঘোষণা।
আর ঘোষণা মানেই শাস্তি।
ময়নুল ঘর থেকে বের হয়। স্ত্রী কিছু বলতে গিয়েও বলে না।
এই শহরে এখন বিদায় বলতে নেই— কারণ বিদায় মানেই শেষ।
রাস্তায় অদ্ভুত নীরবতা। যেন শহর শ্বাস আটকে রেখেছে।
পুলিশ টহল দিচ্ছে, কিন্তু চোখ বন্ধ করে।
তাদের কাজ এখন পাহারা নয়— উপস্থিতি দেখানো।
একটা মোড়ে ময়নুল দেখে— তিনজন লোক দাঁড়িয়ে।
হাতে লাঠি। মুখে কোনো প্রতীক নেই।
এটাই নতুন কৌশল।
দলীয় পরিচয় মুছে ফেলা, শুধু ভয় রেখে দেওয়া।
তারা প্রশ্ন করে না। নামও জিজ্ঞেস করে না।
তারা শুধু তাকায়।
আর তাকানোর ভেতরেই প্রশ্ন লুকানো—
“তুমি কি তালিকাভুক্ত?”
ময়নুল সামনে এগোয়। কেউ তাকে থামায় না।
কারণ শিক্ষক এখনো কিছুটা নিরাপদ।
কিন্তু কতক্ষণ?
একই সময়ে শহরের আরেক প্রান্তে একটি গোপন বৈঠক বসে।
রুবেল, ফারুক আর আরও কয়েকজন।
কথা হচ্ছে খুব ঠান্ডা মাথায়।
“কাল সকালে সমস্যা হলে?” একজন প্রশ্ন করে।
রুবেল হেসে বলে, “সমস্যা হবে না। ভয় কাজ করছে।”
ফারুক যোগ করে, “তালিকার অর্ধেকই কাল আসবে না।”
এই বাক্যগুলো মাইকে ওঠে না, কিন্তু সিদ্ধান্তে রূপ নেয়।
এদিকে সিফাত খবর পায়— তার নাম তালিকার একেবারে ওপরে।
কারণ সে শুধু প্রশ্ন করেনি, সে লিখেছে।
রাত দশটায় প্রথম বড় ঘটনা ঘটে।
একটি বাড়িতে আগুন।
কার বাড়ি— তা নিয়ে কোনো সংবাদ নেই।
কারণ সংবাদ মানেই দায়।
আগুন জ্বলছে, কিন্তু ফায়ার সার্ভিস আসে দেরিতে।
যখন আসে, তখন শুধু ছাই।
ময়নুল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
সে দেখে— একজন বৃদ্ধ মাটিতে বসে আছে।
তার ঘর পুড়ে গেছে।
সে শুধু বলে, “আমি তো কাউকে ভোট দিইনি…”
এই বাক্যটা সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ এটা প্রমাণ করে— ভয় এখন নির্বিচার।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহর জ্বলে ওঠে।
কোথাও ককটেল, কোথাও লাঠিচার্জ, কোথাও নিখোঁজ।
ময়নুল ফিরে আসে সিফাতের কাছে।
সিফাত বলে, “আমি যদি কাল না থাকি— এই কাগজটা প্রকাশ করবে।”
কাগজে লেখা আছে— নাম, তারিখ, নির্দেশ।
রাষ্ট্রের ভেতর থেকে রাষ্ট্রকে ভাঙার নথি।
ময়নুল জানে— এই কাগজ রাখা মানেই মৃত্যুদণ্ড।
রাত তিনটার দিকে দরজায় আবার কড়া নাড়ে।
এবার ভদ্র নয়।
দরজা ভাঙার শব্দ।
সিফাত জানে— সময় শেষ।
সে জানালা দিয়ে পালাতে চায়।
একটি গুলি।
শব্দটা খুব ছোট।
কিন্তু শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়।
সিফাত পড়ে যায়।
রক্ত মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে।
ময়নুল চিৎকার করে না।
কারণ চিৎকার এখানে নিষিদ্ধ।
লোকগুলো বলে, “ভুল জায়গায় ছিল।”
এটাই এখন সবচেয়ে প্রচলিত বাক্য।
ভোর হয়।
আজ ভোটের দিন।
শহর শান্ত।
অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
ভোটকেন্দ্র খোলে।
লাইনে মানুষ নেই।
কিন্তু ভয়ের ছায়া আছে।
ময়নুল একা দাঁড়িয়ে থাকে।
তার হাতে সিফাতের কাগজ।
সে জানে— এই কাগজ যদি বাইরে যায়, এই শহর আর আগের মতো থাকবে না।
পর্ব পাঁচ শেষ হয় এখানেই—
একটি প্রশ্ন নিয়ে:
সত্য কি জীবনের চেয়ে বড়?
পর্ব ছয়ে এই প্রশ্নের উত্তর ভোটের বাক্স নয়— মানুষ দেবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন