১৮ টি বুলেটের পরে | রাষ্ট্রীয় নীরবতায় নিহত মানুষের গল্প। অধ্যায় -১(প- ১,২)
১৮ টি বুলেটের পরে
এস এফ সেলিম আহম্মেদ
অধ্যায় ১ (প-১) : ২৯ মার্চ ২০১৭ | রাত ১১টা ৪৫
রাত ১১টা ৪৫ মিনিট—সময়টা এমন, যখন শহর ঘুমিয়ে পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগরীর চন্দনপুর এলাকার ওই সরু গলিটায় আলো ছিল, কিন্তু আলোয় প্রাণ ছিল না। স্ট্রিটলাইটের নিচে পড়ে থাকা ছায়াগুলোও যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল। এই শহর বহু রাত দেখেছে, বহু শব্দ শুনেছে, কিন্তু কিছু কিছু রাত থাকে—যে রাতে শব্দের চেয়ে নীরবতা বেশি ভয়ংকর।
নুরুল আলম নুরু তখন গভীর ঘুমে। দিনভর রাজনৈতিক কাজ, মানুষের সঙ্গে কথা, ফোন, ছোট ছোট সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে শরীর ক্লান্ত ছিল। এই ক্লান্তি তাকে নির্ভার করেছিল। সে জানত না, আজকের রাতে রাষ্ট্র তার দরজায় কড়া নাড়বে।
ঘরের ভেতর ফ্যান ঘুরছিল। একঘেয়ে শব্দ। এই শব্দটাই পরে ভাগ্নে রাশেদুল ইসলামের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসবে। কারণ, এই ফ্যানের শব্দের মাঝেই বাড়ির বাইরে এসে থেমেছিল একটি সাদা মাইক্রোবাস।
মাইক্রোবাসটির নম্বর প্লেট চোখে পড়ার মতো কিছু ছিল না। কোনো উচ্চ শব্দে ব্রেক কষেনি। ইঞ্জিন বন্ধ করার সময়ও এমনভাবে করা হয়েছিল, যেন কেউ টের না পায়। এই কাজ যারা করে, তারা জানে— কীভাবে শহরের বুকের ভেতরেও অদৃশ্য থাকা যায়।
দরজায় শব্দ হয়। ধাক্কা নয়, লাথি নয়— বরং এমন এক আত্মবিশ্বাসী শব্দ, যেন দরজার ওপাশের মানুষগুলো জানে, এই দরজা খুলতেই হবে।
রাশেদুল ইসলাম তখন আধা ঘুমে। সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। তার মাথায় একটুও আসেনি, এই মুহূর্তের সিদ্ধান্ত তার সারাজীবনের বোঝা হয়ে থাকবে।
দরজা খুলতেই কয়েকজন মানুষ ভেতরে ঢুকে পড়ে। পুলিশ—এই পরিচয়টাই যথেষ্ট ছিল। কেউ ওয়ারেন্ট দেখায়নি। কেউ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। একজন শুধু বলেছিল— “নুরু কে?”
এই প্রশ্নটার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল সিদ্ধান্ত। নুরু বিছানায় উঠে বসে। তার চোখে বিস্ময়, ভয় নয়। কারণ সে তখনও বিশ্বাস করছিল— রাষ্ট্র এমন কিছু করতে পারে না।
“আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।” এই বাক্যটা বলা হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। যেন এটা কোনো আমন্ত্রণ।
নুরু কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু বলা হয়নি। কারণ হাতকড়ার শব্দটা তার কথাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। এই শব্দ খুব জোরে ছিল না, কিন্তু এই শব্দই একটি জীবনের বাকিটা সময়কে গ্রাস করার জন্য যথেষ্ট।
রাশেদুল তখনো দাঁড়িয়ে। তার চোখের সামনে মামাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে কিছু বলতে পারেনি। কারণ ভয় এমনই— ভয় মানুষকে বোবা করে দেয়।
নুরুর চোখে কাপড় বাঁধা হয়। হাত পেছনে নেয়া হয়। মুখে কোনো কথা নেই। কোনো চিৎকার নেই। এই নীরবতাই পরে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে।
মাইক্রোবাসটা গলি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। চন্দনপুর এলাকা আবার আগের মতো শান্ত। শুধু একটি ঘরে ঘুম আর ফেরে না।
এই রাতেই রাষ্ট্র প্রথম সিদ্ধান্ত নেয়— নুরুর ভাগ্য আদালতে যাবে না।
ঠিক এই একই রাষ্ট্র, দুই বছর আগে আরেক রাতে আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
২০১৫ সাল। নুরুজ্জামান জনি তখন জীবনের একেবারে অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্তা। ঘরে আসবে প্রথম সন্তান। এই অপেক্ষা মানুষকে বদলে দেয়। জনিও বদলেছিল।
সেদিন জনি কোনো সন্ত্রাসী ছিল না। সে ছিল একজন ভীত মানুষ। হতে যাওয়া একজন বাবা।
সে কাঁদছিল। পুলিশের পা ধরে। এই দৃশ্য পত্রিকার পাতায় ছোট করে এসেছিল। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যটা ছিল অনেক বড়, অনেক লজ্জার।
“স্যার, আমাকে ক্রসফায়ার দিয়েন না। আমি আর রাজনীতি করবো না। আর মাত্র এক মাস। আমার সন্তানটা আসবে।”
এই মিনতি রাষ্ট্র শোনে না। কারণ রাষ্ট্র যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন গর্ভ, সন্তান, ভবিষ্যৎ—কিছুই হিসাবের মধ্যে থাকে না।
একটা মানুষ মারতে একটি বুলেটই যথেষ্ট। কিন্তু জনির বুকে ঢুকেছিল আঠারোটি। এই সংখ্যা কোনো ভুল নয়। এই সংখ্যা পরিকল্পনার।
পরদিন শিরোনাম হয়েছিল— “ক্রসফায়ারে নিহত ছাত্রদল নেতা।”
কিন্তু কোথাও লেখা হয়নি— একজন নারী বাবাহীন সন্তান জন্ম দেবে।
এই দুই ঘটনার মধ্যে দূরত্ব আছে। সময় আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়নি।
২৯ মার্চ ২০১৭। রাত ১১টা ৪৫। নুরুকে তুলে নেওয়ার পর ঘড়ির কাঁটা চলতে থাকে।
নুরুর জন্য সময় থেমে যায়।
এই অধ্যায় এখানেই শেষ নয়। কারণ এই রাতটা শেষ হয়নি। এই রাতটা টানা তেরো ঘণ্টা চলবে।
আর এই উপন্যাস— ১৮ টি বুলেটের পরে— সেই তেরো ঘণ্টার ভেতরেই ঢুকে পড়বে।
১৮ টি বুলেটের পরে
এস এফ সেলিম আহম্মেদ
অধ্যায় ১ (প - ২): ২৯ মার্চ ২০১৭ | রাত ১১টা ৪৫
মাইক্রোবাসের ভেতরে নুরু কোনো শব্দ করছিল না। চোখে বাঁধা কাপড়ের নিচে অন্ধকার ছিল, কিন্তু সেই অন্ধকারের চেয়েও ভারী ছিল অনিশ্চয়তা। সে বুঝতে পারছিল—এই যাত্রা স্বাভাবিক কোনো থানার দিকে নয়।
গাড়িটা প্রথমে খুব দ্রুত চলেনি। চট্টগ্রাম শহরের ভেতর দিয়ে এমনভাবে ঘুরছিল, যেন রাস্তা চিনে নেওয়া হচ্ছে। নুরুর মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল— কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর সে কোনো দিনই পাবে না। কারণ রাষ্ট্র কখনো “কেন”র উত্তর দেয় না, রাষ্ট্র শুধু সিদ্ধান্ত কার্যকর করে।
একসময় গাড়ি থামে। নুরুকে টেনে নামানো হয়। পায়ের নিচে মাটি নয়, কংক্রিট। ক্যাম্পাসের খোলা জায়গা। নোয়াপাড়া কলেজ।
সে জায়গাটা নুরুর পরিচিত ছিল। কিন্তু চোখ বাঁধা থাকায় পরিচিতিও তখন শাস্তির অংশ।
এখানেই শুরু হয় প্রথম ধাক্কা। কোনো প্রশ্ন নয়। কোনো বক্তব্য নয়। শুধু শরীরের ওপর শরীরী ভাষা।
একটি ঘুষি। তারপর আরেকটি। নুরু পড়ে যায়। উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয় না। কারণ রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেয় না।
এই নির্যাতনের সময় কেউ গালাগালি করছিল না। এই নীরব নির্যাতনই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এতে কোনো আবেগ নেই, শুধু কাজ আছে।
এরপর আবার গাড়ি। এবার অন্য গাড়ি। ফজলে করিমের লোকজন। এই নামগুলো নুরু আগেও শুনেছে। রাজনীতির মাঠে নামগুলো ঘোরে, কিন্তু আজ নামগুলো ঘোরে শরীরের ওপর।
নোয়াপাড়া পুলিশ ক্যাম্প। রাত অনেকটা পেরিয়েছে। কিন্তু নুরুর জন্য রাতের হিসাব বন্ধ হয়ে গেছে।
চোখে বাঁধা কাপড় খোলা হয় না। হাত রশি দিয়ে বাঁধা। মুখে কোনো কথা নেই। কথা বলার সুযোগও নেই।
এই তেরো ঘণ্টার প্রতিটা মিনিট একেকটা আলাদা শাস্তি।
নুরু জানে না— বাইরে তখন কী হচ্ছে। সে জানে না— তার পরিবার কী ভাবছে। সে জানে না— ভোর আসবে কিনা।
রাষ্ট্র জানে। রাষ্ট্র জানে, এই তেরো ঘণ্টার শেষে একটি লাশ তৈরি হবে।
এই একই রাষ্ট্র ২০১৫ সালে জনির ক্ষেত্রেও জানত। জনির চোখের সামনে তার সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেঙে দিয়েছিল।
জনির বুকে ঢোকা আঠারোটি বুলেট শুধু তাকে মারেনি, একটি অনাগত জীবনকেও অনাথ করে দিয়েছিল।
রাষ্ট্র তখনও বলেছিল— সংঘর্ষ।
এখনও বলবে— লাশ উদ্ধার।
রাত গড়িয়ে যায়। ১৩ ঘণ্টা। এই সময়টুকুতে একজন মানুষকে ভেঙে ফেলা যায়— শরীর, আত্মা, ইতিহাস।
ভোরের দিকে, নুরুর মাথায় গুলি করা হয়। এটা শেষ কাজ। এটা ছিল পরিকল্পনার শেষ ধাপ।
এরপর আর কোনো তাড়া নেই। কারণ মৃত মানুষ রাষ্ট্রের জন্য আর ঝুঁকি নয়।
রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়ন। কর্ণফুলী নদীর তীর। এই জায়গাটা নির্বাচিত। কারণ নদী সবসময় প্রমাণ গিলতে চায়।
লাশ ফেলে দেওয়া হয়। হাত-পা বাঁধা। চোখ বাঁধা। মুখে ওড়না।
৩০ মার্চের সকাল। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। সংবাদ আসে। ভাষা তৈরি হয়।
“মাথায় গুলির চিহ্ন। সারা শরীরে আঘাত। পরিচয় নিশ্চিত— বিএনপির ক্যাডার।”
এই বাক্যগুলোই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের বিচার।
কিন্তু ইতিহাস অন্যভাবে হিসাব রাখে। ইতিহাস জানে— নুরু কোনো দিন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়নি।
তবুও তার বিচার হয়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে।
এই অধ্যায় এখানেই থামছে। কিন্তু গল্প থামছে না।
কারণ ১৮ টি বুলেটের পরে রাষ্ট্র সবসময়ই বলে— সব ঠিক আছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন