১৮ টি বুলেটের পরে | অধ্যায় ৩ : রাষ্ট্র যখন নীরব চরিত্র

 ১৮ টি বুলেটের পরে  

(অধ্যায় ৩)


এস এফ সেলিম আহম্মেদ  

কবি, লেখক ও গবেষক।


মূল অংশ:


রাত নামলেই শহরটা অন্য রকম হয়ে ওঠে।  

দিনের আলোয় যে শহর কথা বলে, রাতে সে শহর চুপ করে যায়।  

এই চুপ করে যাওয়ার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দগুলো।


অধ্যায় দুইয়ের সেই রাত—  

১৩ ঘণ্টার নির্যাতন, বাঁধা চোখ, বাঁধা হাত, আর একটি নদীর পাড়ে পড়ে থাকা নিথর শরীর—  

সবকিছু যেন শহরের স্মৃতিতে জমে আছে।


কিন্তু রাষ্ট্রের স্মৃতিতে নেই।


রাষ্ট্র স্মৃতি রাখতে চায় না।  

রাষ্ট্র কেবল ফাইল বানায়, রিপোর্ট লেখে, শিরোনাম ঠিক করে।  

মানুষের জীবন সেখানে একটি প্যারাগ্রাফ,  

আর মৃত্যু একটি সাবহেডিং।


নুরু মারা যাওয়ার পরের সকালটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিল।  

পাখি ডেকেছিল, দোকান খুলেছিল, বাস চলেছিল।  

শুধু একটি বাড়িতে কেউ কথা বলেনি।


নুরুর মা সকাল থেকে বারান্দায় বসে ছিলেন।  

তিনি জানতেন, আজ কিছু একটা ঘটবে।  

গত রাতের ঘুম না হওয়া চোখে তিনি বারবার রাস্তার দিকে তাকিয়েছেন।  

কিন্তু কোনো গাড়ি থামেনি, কোনো ছেলে দরজায় এসে ডাকেনি—  

“মা, আমি চলে এসেছি।”


রাষ্ট্র তখন তার কাজ সেরে ফেলেছে।


একটি মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া,  

তাকে ভেঙে ফেলা,  

শেষে নদীর পাড়ে ফেলে রাখা—  

এই পুরো প্রক্রিয়াটার কোথাও রাষ্ট্রের কণ্ঠ কাঁপেনি।


কারণ রাষ্ট্র জানে,  

ভয় দেখাতে পারলে বিচার লাগে না।


নুরুর লাশ উদ্ধারের পরদিন পত্রিকায় ছোট একটি খবর ছাপা হয়।  

চার কলামের নিচে।  

ছবি নেই।  

মানবিক গল্প নেই।  

শুধু লেখা—  

“বিএনপির ক্যাডার নিহত।”


এই একটি শব্দ— “ক্যাডার”—  

সব প্রশ্ন বন্ধ করে দেয়।


কেউ আর জানতে চায় না,  

সে কীভাবে ঘর থেকে তুলে নেওয়া হলো,  

কেন তার চোখ বাঁধা ছিল,  

কেন তার মুখে ওড়না গুঁজে দেওয়া হয়েছিল।


রাষ্ট্র চায় মানুষ প্রশ্ন না করুক।  

আর মানুষও ধীরে ধীরে প্রশ্ন করা ভুলে যায়।


এই ভুলে যাওয়াই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য।


নুরু শুধু একজন ব্যক্তি ছিল না।  

সে ছিল একটি ধারাবাহিকতার অংশ।  

তার আগে জনি,  

তার আগে আরও অনেকে,  

তার পরেও আরও আসবে—  

যদি ইতিহাস মনে না রাখা হয়।


অধ্যায় একে ১৮টি বুলেট যেমন একটি প্রতীক ছিল,  

অধ্যায় দুইয়ে ১৮ ঘণ্টা ছিল একটানা অন্ধকার,  

এই অধ্যায়ে রাষ্ট্র নিজেই একটি চরিত্র।


রাষ্ট্র এখানে কোনো দৃশ্যমান মানুষ নয়।  

রাষ্ট্র এখানে একটি ব্যবস্থা।  

একটি নীরব সম্মতি।  

একটি সম্মিলিত ভীরুতা।


যখন কাউকে তুলে নেওয়া হয়,  

তখন শুধু পুলিশ থাকে না—  

থাকে আশপাশের মানুষের চুপ করে থাকা।  

থাকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ।  

থাকে কিছু “সুশীল” মানুষের বিবৃতি।


নুরু হত্যার পরও তাই হলো।


কয়েকজন বিবৃতি দিলো,  

কয়েকজন শোক প্রকাশ করলো,  

আর বাকিরা বললো—  

“এখন সময় ঠিক না।”


এই “সময় ঠিক না”-ই  

সব হত্যার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী।


নুরুর ছোট ভাই মামলার কাগজ হাতে থানায় থানায় ঘুরেছে।  

কেউ ফাইল নিয়েছে, কেউ ফেরত দিয়েছে।  

কেউ বলেছে— “উপর থেকে চাপ আছে।”


এই “উপর” আসলে কোথায়?  

কেউ জানে না।  

আবার সবাই জানে।


রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—  

তার কোনো মুখ নেই,  

কিন্তু তার হাত সবখানে।


এই অধ্যায়ে আমরা বুঝতে শুরু করি,  

১৮টি বুলেটের পরে শুধু একজন মানুষ মারা যায় না,  

মরে যায় বিচার,  

মরে যায় নৈতিকতা,  

মরে যায় সমাজের মেরুদণ্ড।


নুরুদের গল্প তাই একক কোনো ঘটনা নয়।  

এটা একটি প্যাটার্ন।  

এটা একটি নকশা।


এই নকশার ভেতরেই  

পরবর্তী অধ্যায়ের অন্ধকার অপেক্ষা করছে।


কারণ রাষ্ট্র যখন একবার রক্তে অভ্যস্ত হয়ে যায়,  

তখন সে আর সহজে থামে না।



(অধ্যায় ৩ – সম্প্রসারিত অংশ ও ক্লিফহ্যাঙ্গার)



রাত নামলে শহরটা কেবল অন্ধকার হয় না,

শহরটা স্মৃতিহীন হয়ে যায়।

দিনের আলোয় যে শহর প্রশ্ন করে,

রাতে সেই শহর উত্তর দিতে ভুলে যায়।


নুরুর মৃত্যুর পর প্রথম তিন দিন

তার বাড়িতে কোনো রেডিও বাজেনি,

কোনো টেলিভিশন চালু হয়নি।

খবর শুনলে মানুষ ভেঙে পড়ে—

এই ভয়ে সবাই নীরব ছিল।


নুরুর মা বারবার একই প্রশ্ন করছিলেন,

“ও কি খুব কষ্ট পেয়েছিল?”

কেউ উত্তর দিতে পারেনি।

কারণ সবাই জানত—

উত্তরটা জানলে নিজের বুকেই শ্বাস আটকে যাবে।


রাষ্ট্র এমনভাবে হত্যা করে,

যেন নিহত ব্যক্তির পরিবারকেও অপরাধী বানিয়ে দেয়।

তাদের কান্না হয় সন্দেহজনক,

তাদের প্রতিবাদ হয় রাষ্ট্রবিরোধী।


নুরুর জানাজায় মানুষ এসেছিল,

কিন্তু খুব জোরে কেউ কাঁদেনি।

কেউ স্লোগান দেয়নি।

ভয় ছিল—ক্যামেরা আছে,

ভয় ছিল—পরের নামটা নিজের হতে পারে।


এই ভয়ই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য।


নুরুর ছোট বোন লাশের পাশে দাঁড়িয়ে

একবারও কাঁদেনি।

সে শুধু তাকিয়ে ছিল।

তার চোখে ছিল না পানি,

ছিল আগুন।


সে বুঝে গিয়েছিল—

এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়।

এই মৃত্যু শেখানোর জন্য।

বার্তা দেওয়ার জন্য।


১৮টি বুলেট যেমন জনির শরীরে ঢুকে

একটি রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা লিখে দিয়েছিল,

নুরুর শরীরে চালানো ১৩ ঘণ্টার নির্যাতন

একই বার্তা আবারও লিখেছে—

“চুপ থাকো।”


কিন্তু ইতিহাস জানে,

চুপ করানো মানুষ একদিন কথা বলবেই।


নুরুর মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর

তার বন্ধুরা রাতে একটি ঘরে বসেছিল।

আলো নিভিয়ে।

মোবাইল বন্ধ করে।

দরজা ভেতর থেকে আটকানো।


তারা কথা বলছিল খুব ধীরে।

যেন দেয়ালেরও কান আছে।


কেউ বললো—

“এটা থামবে না।”

কেউ বললো—

“লড়াই করলে সবাই মরব।”

আর কেউ একজন বললো—

“চুপ থাকলে সবাই মরব—একদিন।”


এই কথাটার পর ঘরে নীরবতা নেমে আসে।

ঠিক সেই নীরবতা,

যেটা রাষ্ট্র সবচেয়ে ভয় পায়।


কারণ নীরবতা ভাঙার আগেই

সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়।


রাষ্ট্র তখন নিশ্চিন্ত।

ফাইল বন্ধ।

রিপোর্ট জমা।

কেস ঝুলে আছে।


রাষ্ট্র ভাবে—

গল্প শেষ।


কিন্তু গল্প শেষ হয় না।

গল্প শুধু চরিত্র বদলায়।


নুরুর ডায়েরিটা

তার মৃত্যুর পর কেউ খুঁজে পায়নি।

ঘর তছনছ করা হয়েছিল,

কিন্তু ডায়েরি নেই।


শেষ যে পাতাটা সে লিখেছিল,

সেখানে ছিল মাত্র একটি লাইন—


“আমাকে যদি মেরে ফেলা হয়,

তবে মনে রেখো—আমি অপরাধী ছিলাম না।”


এই লাইনটাই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।


কারণ একজন মানুষকে মেরে ফেলা যায়,

কিন্তু তার কথাকে না।


অধ্যায় তিন এখানেই থামে,

ঠিক সেই মুহূর্তে—

যখন প্রশ্নটা প্রথমবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে—


এই রাষ্ট্র কি শুধু মানুষ মারে,

নাকি সত্যকেও হত্যা করে?


আর যদি সত্য বেঁচে থাকে,

তবে পরের নিশানা কার?


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

মাতৃ ভাষা | রক্তে লেখা একুশ