ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ২)
ক্ষমতার উন্মত্ত জবান: ভোটের মাঠের কাহিনী (পর্ব ২)
— এস এফ সেলিম আহম্মেদ, কবি, লেখক ও গবেষক
পর্ব একের ঘটনার পর শহর আর আগের মতো নেই। ভোরের আলো ফুটলেও মানুষের চোখে আলো নেই—আছে শঙ্কা, অবিশ্বাস আর জমে থাকা রাগ।
ময়নুল ঘুম ভাঙতেই মোবাইল হাতে নিল। একের পর এক মিসড কল। রাতভর শহরের দক্ষিণ প্রান্তে সংঘর্ষ হয়েছে। পোস্টার ছেঁড়া থেকে শুরু হয়ে আগুন, তারপর রড, ছুরি—শেষে রক্ত।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, ক্ষমতার উন্মত্ত জবান ততই পশুর মতো ধারালো হয়ে ওঠে।
রুবেল আজ আর প্রতিশ্রুতির কথা বলে না। তার মাইকে এখন শ্লোগান নয়—হুমকি। “আমাদের বিরোধীরা দেশের শত্রু। ওদের শিক্ষা দিতে হবে!”
জনতার ভিড় থেকে কেউ প্রশ্ন করে না। কারণ প্রশ্ন মানেই সন্দেহ, আর সন্দেহ মানেই শত্রু।
শহরের মোড়ে মোড়ে চা-স্টলগুলো এখন আর রাজনীতির আড্ডা নয়—এগুলো হয়ে উঠেছে গোপন যুদ্ধঘাঁটি। কেউ লাঠি লুকাচ্ছে বেঞ্চের নিচে, কেউ ব্যাগে ভরে এনেছে কাঁচের বোতল।
শীলা আজ দোকান খোলেনি। তার দোকানের সামনে গতরাতে ককটেল ফেটেছে। ভাঙা কাঁচের টুকরো এখনো রাস্তায় ছড়ানো।
“ভোট দিতে যাব?”—সে প্রশ্ন এখন বিলাসিতা।
ময়নুল স্কুলে পৌঁছাতেই খবর পেল—একজন ভোটার তালিকা সংশোধন করতে এসে মার খেয়েছে। তার অপরাধ? সে নাকি “ভুল প্রতীকের” লোক।
ভোটের মাঠে মানুষ আর মানুষ নেই—এখানে আছে দল, রঙ, চিহ্ন আর হিংস্র পরিচয়।
সিফাত সাংবাদিক হিসেবে ছবি তুলতে গিয়েছিল। ফেরার সময় ক্যামেরা ভাঙা, শরীর রক্তাক্ত।
“সত্য বললে আর কেউ নিরাপদ নেই”—সে ফিসফিস করে বলে।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শহরের উত্তর প্রান্তে এক মিছিল আরেক মিছিলে ধাক্কা দেয়।
প্রথমে গালি, তারপর ইট। তারপর রড।
কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে—“মেরে ফেল!”
এক মুহূর্তের মধ্যেই ভোটের মাঠ পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।
ময়নুল দূর থেকে দেখে—একজন যুবক মাটিতে পড়ে আছে, নড়ছে না। চারপাশে কেউ এগোচ্ছে না।
কারণ এখন মানুষ নয়, দল আগে।
পুলিশ আসে দেরিতে। আসে যখন রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে শহরটা কেমন বদলে যায়। আলো জ্বলে, কিন্তু অন্ধকার বাড়ে।
রাহাজানি শুরু হয়। নাম জিজ্ঞেস করে, প্রতীক জানতে চায়।
ভুল উত্তর মানেই বিপদ।
ময়নুল বাড়ি ফেরার পথে দেখে—এক বৃদ্ধ ভোটার তালিকা হাতে বসে কাঁদছে। সে ফিসফিস করে বলে, “আমি কি অপরাধ করেছি? শুধু ভোট দিতে চেয়েছিলাম…”
এই কান্না কোনো মঞ্চের মাইকে ওঠে না। এটা সংবাদ হয় না।
রাত গভীর হলে শহরের এক প্রান্তে আগুন জ্বলে ওঠে। কোনো অফিস, কোনো বাড়ি—কে জানে।
পর্ব দুই এখানেই থামে না।
শেষ দৃশ্য— ময়নুল খবর পায়, যে যুবকটি দুপুরে মাটিতে পড়ে ছিল… সে মারা গেছে।
আর তার পকেটে পাওয়া গেছে— ভোটার স্লিপ।
ভোট দেওয়ার আগেই যার ভোট শেষ হয়ে গেল।
শহর নিঃশব্দ। ঝড়ের আগে যেমন হয়।
পর্ব তিনে এই নীরবতা ভাঙবে। আর ভাঙবে খুব নির্মমভাবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন