দ্রোহ : শাসনের অন্ধকারে মানুষের আলোকিত অস্বীকার
দ্রোহ : শাসনের অন্ধকারে মানুষের আলোকিত অস্বীকার
লেখক: এস এফ সেলিম আহম্মেদ
কবি, লেখক ও গবেষক
প্রস্তাবনা
মানুষ জন্মগতভাবেই অনুগত নয়; মানুষ জন্মগতভাবে প্রশ্নবোধক। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে যখনই ক্ষমতা প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করেছে, তখনই জন্ম নিয়েছে দ্রোহ। দ্রোহ কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ নয়—এটি দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙার ভাষা। এটি উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, বরং বিবেকের সংগঠিত অস্বীকার।
শাসকরা প্রায়ই দ্রোহকে বিশৃঙ্খলা বলে চিহ্নিত করে, কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে—সব বিশৃঙ্খলাই ধ্বংসাত্মক নয়; কিছু বিশৃঙ্খলা সভ্যতার পুনর্জন্ম ঘটায়। দ্রোহ সেই অনিবার্য অস্বস্তি, যা সমাজকে তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
দ্রোহের নৈতিক জন্মভূমি
দ্রোহের উৎপত্তি ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ক্ষমতা যখন ন্যায় থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার বৈধতা ক্ষয় হতে শুরু করে। এই ক্ষয় থেকেই জন্ম নেয় দ্রোহের নৈতিকতা।
গ্রিক সভ্যতায় সক্রেটিস রাষ্ট্রের আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি শক্তি দিয়ে, দাঁড়িয়েছিলেন যুক্তি দিয়ে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—আইন কি সর্বদা ন্যায়সঙ্গত? তাঁর মৃত্যুদণ্ড আসলে ছিল এক রাষ্ট্রের আত্মরক্ষামূলক আতঙ্ক। সক্রেটিস দেখিয়েছিলেন, দ্রোহ সব সময় উচ্চকণ্ঠ নয়; কখনো কখনো এটি শান্ত প্রশ্নের মধ্যেই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
পরে রুশো বললেন, মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এই শৃঙ্খল ভাঙার চিন্তাই আধুনিক দ্রোহের বীজ বপন করে।
প্রাচীন সভ্যতা ও অবদমিত দ্রোহ
প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলো টিকে ছিল ভয় ও ধর্মের যৌথ নিয়ন্ত্রণে। মিশরের পিরামিড শুধু স্থাপত্য নয়, তা দাসশ্রমের নীরব আর্তনাদ। রোমান সাম্রাজ্যে স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে দাস বিদ্রোহ ছিল ইতিহাসের প্রথম সংগঠিত শ্রেণি-দ্রোহ।
স্পার্টাকাস জানতেন, তাঁর বিদ্রোহ জয়ী নাও হতে পারে; কিন্তু তিনি এটাও জানতেন—নিরবচ্ছিন্ন দাসত্বের চেয়ে প্রতিরোধের মৃত্যু সম্মানজনক। ইতিহাস প্রায়ই বিজয়ীদের কথা লেখে, কিন্তু সভ্যতার নৈতিক অগ্রগতি ঘটে পরাজিত দ্রোহীদের হাত ধরেই।
মধ্যযুগ: ধর্ম, রাষ্ট্র ও বিবেকের সংঘর্ষ
মধ্যযুগে দ্রোহ সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ তখন রাষ্ট্র ও ধর্ম একাকার। চার্চের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। তবু মার্টিন লুথার প্রশ্ন তুললেন—ধর্ম কি ক্ষমতার সম্পত্তি?
এই প্রশ্নই ইউরোপে নবজাগরণের পথ তৈরি করে। একই সময়ে মুসলিম সভ্যতায় সুফিবাদ রাষ্ট্রীয় কঠোরতার বিরুদ্ধে মানবিকতার নরম কিন্তু দৃঢ় দ্রোহ গড়ে তোলে। মরমিয়া সাধকদের কণ্ঠে দ্রোহ ছিল আত্মিক স্বাধীনতার ঘোষণা।
হাল্লাজ মানসুরের “আনাল হক” উচ্চারণ আসলে ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দাবি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর দ্রোহ শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে আছে।
আধুনিক রাষ্ট্র ও বিপ্লবের দ্বন্দ্ব
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্রোহকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। ফরাসি বিপ্লব প্রমাণ করে, শাসকের ঐশ্বরিক অধিকার একটি রাজনৈতিক মিথ। রাজাকে উৎখাত করে জনগণ ক্ষমতার মালিকানা দাবি করে।
কিন্তু এখানেই দ্রোহের দ্বন্দ্ব—বিপ্লব কি সত্যিই শাসনের অবসান ঘটায়, নাকি কেবল শাসকের মুখ বদলে দেয়? রুশ বিপ্লব শোষণের বিরুদ্ধে জন্ম নিলেও অচিরেই নতুন রাষ্ট্রীয় দমনব্যবস্থার জন্ম দেয়। ইতিহাস তাই শেখায়—দ্রোহের সাফল্য শুধু ক্ষমতা দখলে নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠায়।
উপনিবেশবাদ: বৈশ্বিক দ্রোহের কাল
উপনিবেশবাদ ছিল আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে সুসংগঠিত লুণ্ঠনব্যবস্থা। এর বিরুদ্ধে এশিয়া ও আফ্রিকার দ্রোহ কেবল রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও।
ভারতবর্ষে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল সাম্রাজ্যবাদের প্রথম ফাটল। পরে গান্ধীর অহিংস আন্দোলন প্রমাণ করে, দ্রোহের শক্তি কেবল অস্ত্রে নয়, নৈতিক দৃঢ়তায়ও নিহিত।
একই সময়ে আফ্রিকায় ফ্রান্ৎস ফানোঁ দেখিয়েছেন—উপনিবেশিত মানুষের মানসিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক মুক্তি অসম্পূর্ণ।
বাংলা ও দ্রোহের উত্তরাধিকার
বাংলা কখনোই নির্বাক ছিল না। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে নীল বিদ্রোহ—সবই শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের সংগঠিত আর্তনাদ। তেভাগা আন্দোলনে কৃষকরা শুধু জমির অংশ নয়, মর্যাদা দাবি করেছিল।
ভাষা আন্দোলন ছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক দ্রোহ—রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্রের ভেতরের বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সেই দ্রোহের চূড়ান্ত রূপ—যেখানে অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
স্বাধীনতার পরও দ্রোহ থেমে যায়নি। কারণ রাষ্ট্র বদলালেও ক্ষমতার চরিত্র সবসময় বদলায় না।
সমকালীন দ্রোহ: ডিজিটাল ও নৈতিক সংকট
আজকের দ্রোহ অনেক সময় ফেসবুক স্ট্যাটাসে সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কখনো রাজপথে রক্ত ঝরায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্রোহকে দৃশ্যমান করেছে, কিন্তু গভীরতা কমিয়েছে—এমন অভিযোগও অমূলক নয়।
আজকের বড় প্রশ্ন—দ্রোহ কি সত্যিই মুক্তির জন্য, নাকি তা কেবল ক্ষোভের সাময়িক বিস্ফোরণ? নৈতিক দিকনির্দেশনা ছাড়া দ্রোহ আত্মবিনাশী হতে পারে।
উপসংহার
দ্রোহ কোনো রোমান্টিক শব্দ নয়; এটি একটি দায়িত্ব। মার্জিত দ্রোহ মানে শালীনতা দিয়ে অন্যায়কে প্রশ্ন করা, যুক্তি দিয়ে ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলা।
সভ্যতা এগিয়েছে সেইসব মানুষের হাত ধরে, যারা বিনয়ী কণ্ঠে কিন্তু দৃঢ় চিত্তে বলেছিল—“এভাবে আর নয়।”
যতদিন অন্যায় থাকবে, ততদিন দ্রোহ থাকবে। প্রশ্ন শুধু একটাই—আমাদের দ্রোহ কি মানবিক, নাকি প্রতিশোধপরায়ণ?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন