সুষ্ঠ রাজনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু আমাদের রাজনৈতিক নেতারাই
# রাজনৈতিক নেতারা সুষ্ঠ রাজনীতির বিরুদ্ধে
**লেখক:** এস এফ সেলিম আহম্মেদ
কবি, লেখক ও কলামিস্ট ।
সুষ্ঠ রাজনীতি এখন আর কোনো বাস্তব চর্চা নয়—এটি কেবল বক্তৃতার অলংকার, পোস্টারের শিরোনাম আর নির্বাচনী ইশতেহারের মৃত শব্দ। বাস্তবে সুষ্ঠ রাজনীতি বলতে যা বোঝায়, তা আজকের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়। কারণ সুষ্ঠ রাজনীতি মানে প্রশ্ন, জবাবদিহি, সীমা ও বিবেক—আর এই চারটি জিনিসই ক্ষমতার রাজনীতিতে নিষিদ্ধ।
রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে যতই গণতন্ত্রের গান গাইুন না কেন, আড়ালে তারা সুষ্ঠ রাজনীতিকে শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করেন। সুষ্ঠ রাজনীতি ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, আর নেতারা চান ক্ষমতা যেন লাগামছাড়া ঘোড়ার মতো ছুটে বেড়ায়। লাগাম থাকলে তো আর ইচ্ছেমতো দৌড়ানো যায় না।
## আদর্শ নয়, সুবিধাবাদের রাজনীতি
আজকের রাজনীতি কোনো আদর্শের লড়াই নয়, এটি সুবিধাবাদের প্রতিযোগিতা। এখানে নীতি বদলায় পরিস্থিতি অনুযায়ী, আর আদর্শ বদলায় ক্ষমতার দূরত্ব অনুযায়ী। যে নীতি গতকাল ছিল দেশবিরোধী, আজ সেটাই রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত। রাজনীতিতে সত্য আর মিথ্যার মাঝখানের সীমারেখা এতটাই ঝাপসা যে নেতারা নিজেরাই জানেন না—কখন তারা জনগণকে বলছেন, আর কখন নিজেদের স্বার্থকে।
নেতারা প্রায়ই বলেন, *“আমরা জনগণের রাজনীতি করি।”*
আসলে তারা করেন ক্ষমতার রাজনীতি, যেখানে জনগণ কেবল একটি উপকরণ। ভোটের আগে জনগণ ‘জনতা’, ভোটের পরে তারা ‘ঝামেলা’। নির্বাচনের সময় যাদের দরজায় দরজায় হাত জোড় করে ঘোরা হয়, ক্ষমতায় গেলে তাদেরই কণ্ঠস্বর সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থাকে।
## প্রশ্নই যেখানে অপরাধ
সুষ্ঠ রাজনীতি প্রশ্ন তোলে—
কোথা থেকে এলো এই সম্পদ?
কেন দলের ভেতরে গণতন্ত্র নেই?
কেন একই মুখ, একই পরিবার, একই গোষ্ঠী বারবার ক্ষমতায় আসে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গেলে ইতিহাসের ফাইল খুলতে হয়, আর সেই ফাইলে উন্নয়নের চেয়ে দুর্নীতির পাতাই বেশি। তাই নেতারা প্রশ্নকেই অপরাধ বানান। প্রশ্নকারী হয়ে ওঠে ‘ষড়যন্ত্রকারী’, ‘দেশদ্রোহী’ কিংবা ‘অরাজনৈতিক’।
## পরিবারতন্ত্র ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র
দলীয় রাজনীতি আজ কার্যত পরিবারতন্ত্রে রূপ নিয়েছে। নেতৃত্ব আর রাজনৈতিক যোগ্যতার বিষয় নয়, এটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ। রাজনীতি যেন কোনো জমিদারি—যেখানে জনগণ খাজনা দেয় ভোটের মাধ্যমে, আর শাসন চলে বংশানুক্রমে।
বিরোধী দলে থাকলে নেতাদের মুখে গণতন্ত্রের জন্য হাহাকার, আর ক্ষমতায় গেলে সেই গণতন্ত্রই নাকি রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বদলে যায় ক্ষমতার আসন বদলের সাথে সাথে। এতে বোঝা যায়—নেতারা গণতন্ত্র চান না, তারা চান গণতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ।
## কর্মী আছে, মর্যাদা নেই
রাজনীতিতে কর্মীর মূল্য আছে, কিন্তু মর্যাদা নেই। কর্মীরা মিছিল করে, মামলা খায়, জেল খাটে। আর নেতারা টকশোতে বসে ত্যাগের গল্প শোনান। কর্মীরা থাকে রাজপথে, আর সিদ্ধান্ত হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে।
সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি দেখা যায় তরুণদের প্রশ্নে। নেতারা বলেন, *“তরুণরা রাজনীতিতে আসছে না কেন?”*
তারা আসবে কেন? যেখানে রাজনীতি মানে নীতিহীনতার প্রশিক্ষণ, চাটুকারিতার সনদ আর বিবেক বিসর্জনের বাধ্যবাধকতা। তরুণরা রাজনীতি থেকে দূরে নয়, তারা এই নোংরা ব্যবস্থার কাছ থেকে দূরে থাকতে চায়।
## ব্যর্থতারও কোনো দায় নেই
আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—নেতাদের ব্যর্থতার কোনো মূল্য নেই। ব্যর্থ নীতির জন্য কেউ দায় নেয় না, ভুল সিদ্ধান্তের জন্য কেউ ক্ষমা চায় না। বরং ব্যর্থতাকে সাফল্যের মোড়কে উপস্থাপন করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলে। উন্নয়নের গ্রাফ যতই নিচে নামুক, ভাষণের গ্রাফ ততই ওপরে ওঠে।
রাজনীতি এখন এমন এক মঞ্চ, যেখানে লজ্জা একটি অপ্রাসঙ্গিক অনুভূতি। আজ যে নেতা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, কাল তিনিই নৈতিকতার বক্তা। এই নির্লজ্জ স্বাভাবিকীকরণই সুষ্ঠ রাজনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু।
## দুর্বল প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী ব্যক্তি
গণমাধ্যম, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের অনুকূলে রাখতে পারাটাকেই নেতারা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মনে করেন। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ব্যক্তির ক্ষমতা শক্তিশালী হয়—এই সমীকরণ তারা ভালোভাবেই বোঝেন। তাই সুষ্ঠ রাজনীতি নয়, তারা চান দুর্বল প্রতিষ্ঠান আর শক্তিশালী ব্যক্তি।
সুষ্ঠ রাজনীতি চাইলে দরকার স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও সাহস। কিন্তু এই তিনটি গুণই আজকের রাজনীতিতে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয়। কারণ স্বচ্ছ হলে লুটপাট করা যায় না, নৈতিক হলে অন্যায়কে正ায়ন করা যায় না, আর সাহসী হলে তোষামোদকারীদের ভিড় জমানো যায় না।
## উপসংহার
এই দেশে রাজনীতি বেঁচে আছে, কিন্তু রাজনীতির আত্মা মৃত। কবরের ওপর দাঁড়িয়ে নেতারা উন্নয়নের গল্প শোনান, গণতন্ত্রের প্রশংসা করেন। কবরের ওপর বলা গল্প সবসময়ই সুন্দর শোনায়—কারণ সেখানে মৃতরা প্রতিবাদ করতে পারে না।
সত্যটা হলো—রাজনৈতিক নেতারা সুষ্ঠ রাজনীতির বিরুদ্ধে। তারা তা স্বীকার করেন না, কিন্তু তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি নীরবতা সেটাই প্রমাণ করে। যতদিন সুষ্ঠ রাজনীতি ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে থাকবে, ততদিন এই দেশ কেবল শাসিত হবে—গণতান্ত্রিক হবে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন