চেতনা হারালে উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে যায়—সমাজ ও রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা

 ## চেতনাই সমাজের মূল উন্নয়ন  

### — সমকালীন রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতার আলোকে একটি প্রবন্ধ


সমাজের উন্নয়ন নিয়ে কথা বললেই আমরা সাধারণত দৃশ্যমান কিছু সূচকের দিকে তাকাই—রাস্তা-ঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব উন্নয়ন সমাজকে কতটা মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে আসে একটি মৌলিক সত্য—সমাজের প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি হলো **চেতনা**।


চেতনা ছাড়া উন্নয়ন কেবল কাঠামোগত বিস্তার; আর চেতনাসম্পন্ন সমাজে উন্নয়ন হয়ে ওঠে মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার পথ।


### চেতনা ও সামাজিক আচরণ


চেতনা বলতে শুধু ব্যক্তিগত বোধ নয়, বরং সমাজের সামষ্টিক চিন্তাধারা ও মূল্যবোধকে বোঝায়। মানুষ অন্যায় দেখেও নীরব থাকবে, নাকি প্রতিবাদ করবে—তা নির্ধারিত হয় তার চেতনার মাত্রা দিয়ে। আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা কিংবা বৈষম্য নিয়ে অভিযোগ সর্বত্র; কিন্তু প্রতিবাদ সীমিত। এই বৈপরীত্য আসলে চেতনাগত সংকটেরই প্রকাশ।


যে সমাজে অন্যায়কে “এভাবেই চলে” বলে মেনে নেওয়া হয়, সে সমাজে উন্নয়ন কখনোই মানবিক হতে পারে না।


### সমকালীন রাজনীতি ও চেতনার সংকট


সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শ থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত সহনশীলতা ও জবাবদিহিতা—এসব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তখনই দুর্বল হয়, যখন নাগরিক চেতনা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মানুষ যখন নাগরিকের বদলে কেবল সুবিধাভোগী বা দর্শকে পরিণত হয়, তখন রাজনীতি দখল হয়ে যায় কিছু গোষ্ঠীর হাতে।


চেতনাসম্পন্ন সমাজে রাজনৈতিক নেতা প্রশ্নের মুখোমুখি হন; চেতনাহীন সমাজে নেতা প্রশ্নহীন ক্ষমতা ভোগ করেন।


### আইন, রাষ্ট্র ও নাগরিক দায়িত্ব


আইন যত শক্তিশালীই হোক, নাগরিক চেতনা দুর্বল হলে আইনের শাসন কার্যকর হয় না। আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি—আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগে বৈষম্য; নিয়ম আছে, কিন্তু মানার প্রবণতা নেই। এর মূল কারণ আইন নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক চেতনার অভাব।


আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ভয়ের কারণে নয়, দায়িত্ববোধ থেকে আসা উচিত—আর সেই দায়িত্ববোধ জন্ম নেয় চেতনা থেকে।


### অর্থনীতি, উন্নয়ন ও বৈষম্যের বাস্তবতা


বর্তমান উন্নয়ন ধারায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বৈষম্য কমছে না—বরং অনেক ক্ষেত্রে বাড়ছে। একদিকে ভোগের সংস্কৃতি, অন্যদিকে বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস—এই বৈপরীত্য চেতনাহীন উন্নয়নেরই ফল। যখন উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষ নয়, মুনাফা থাকে; তখন সমাজে স্থিতিশীলতা থাকে না।


চেতনাভিত্তিক উন্নয়ন মানে শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য বণ্টন ও সামাজিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।


### শিক্ষা ও চেতনাগত অবক্ষয়


সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থায় সাফল্য পরিমাপ করা হয় ফলাফল ও চাকরির ভিত্তিতে। কিন্তু শিক্ষার মূল লক্ষ্য—চিন্তাশীল, বিবেকবান ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা—সেটি ক্রমেই উপেক্ষিত হচ্ছে। ফলে আমরা পাচ্ছি দক্ষ কিন্তু অসচেতন মানুষ, যারা প্রশ্ন করতে জানে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস পায় না।


চেতনাবিহীন শিক্ষা সমাজকে আলোকিত করে না; বরং নীরবভাবে অন্ধকারকে দীর্ঘায়িত করে।


### ইতিহাস ও বর্তমানের সংযোগ


ইতিহাস প্রমাণ করে, সমাজে বড় পরিবর্তন এসেছে তখনই, যখন মানুষ অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মানতে অস্বীকার করেছে। ভাষা, অধিকার, গণতন্ত্র—সব আন্দোলনের পেছনে ছিল চেতনার জাগরণ। বর্তমান সময়েও পরিবর্তনের একমাত্র পথ সেই চেতনাগত জাগরণ।


### উপসংহার


সমাজের উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের মানসিক ও নৈতিক উৎকর্ষ। চেতনা থাকলে সীমিত সম্পদেও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা যায়, আর চেতনা না থাকলে প্রাচুর্যও সমাজকে রক্ষা করতে পারে না।


এই কারণেই বলা যায়—  

**চেতনাই সমাজের মূল উন্নয়ন।**  

এটি কাব্যিক উচ্চারণ নয়; এটি সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা থেকে উঠে আসা এক গভীর সত্য।


---


**লেখক:**  

এস এফ সেলিম আহম্মেদ  

কবি, লেখক ও গবেষক

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়া | প্রেমের অতীতের এক হৃদয়স্পর্শী আধুনিক কবিতা

"রমজান" — এস এফ সেলিম আহম্মেদ | আধুনিক আত্মজাগরণের কবিতা

মাতৃ ভাষা | রক্তে লেখা একুশ